Showing posts with label fishing cat. Show all posts
Showing posts with label fishing cat. Show all posts

Thursday, February 6, 2025

মশা মারতে কামান দাগা তো শুনেছেন, তা বলে বিড়াল বাঁচাতে কবাডি খেলা!

 

 

মশা মারতে কামান দাগা তো শুনেছেন, তা বলে বিড়াল বাঁচাতে কবাডি খেলা!

 

সরস্বতী পুজো কেমন কাটল সবার? এই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই পাখা চালাতে হচ্ছে। এখনই আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে গরমটা কেমন পড়তে চলেছে এই বছর! সেদিন একটা অনুষ্ঠানে অভিনেতা জিতু কামালের সঙ্গে কথা হচ্ছিল জিতু বলছিলেন আজকাল আমাদের এখানে শীত পড়ে না। সারা বছর গরম, বর্ষা আর অল্প গরম পড়ে। প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি। সরস্বতী পুজোতেও অন্য উৎসবের মতোই শব্দ দানবের তাণ্ডব চলল। হাওড়ার উলুবেড়িয়ার ভিডিও দেখে আতঙ্ক হচ্ছিল। তারস্বরে ডিজে চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ নেচে চলেছে। এ কোন আমদানি করা সংস্কৃতি বুঝতে পারছি না। আমি যে পাড়ায় থাকি সেখানেও উদ্দাম ভয়াবহ সব গান চলল। গান পয়েন্টে ঘুমের দফারফা হল রাত আড়াইটে অবধি। বুঝি না প্রশাসন, পুলিশ কী করেন? সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। ছাত্রদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। মাইক আর লাউড স্পিকারে নিয়ন্ত্রণ আনলে কি ভোট ব্যাঙ্কে চাপ পড়ত? বা ছাপ পড়ত? তাই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে গেলেন তাঁরা যাদের পাহারা দেওয়াটাই দস্তুর! উলুবেড়িয়ার উদ্দাম নাচের ছবি যখন ভাইরাল হচ্ছে তখনই সম্রাট, সায়ন, চিত্রক, কল্যাণী দিরা তুলে ধরলেন এক অন্য ছবি। উলুবেড়িয়া থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে ঘটল এমন এক ঘটনা যা ওই উদ্দাম, অর্থহীন, মগজহীনতার মুখে সজোরে একটা থাপ্পড় মারল।

 


পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র পর্ষদ, হাওড়া জেলা বন বিভাগ, জেলা পরিষদ, বিধায়ক আর হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ আমতার গাজীপুর পঞ্চানন সংঘে আয়োজন করল এক কবাডি প্রতিযোগিতা। না প্রো কবাড্ডি লিগের ম্যাচ না। ছিল না ততটা জৌলুসও। কিন্তু এই কবাডির গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণী মেছো বিড়ালের সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারে মেয়েদের এই কবাডি টুর্নামেন্ট।

 


পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র পর্ষদের সিনিয়র অফিসার সৌমেন্দ্রনাথ ঘোষ , হাওড়া জেলা মুখ্য বন আধিকারিক দীপক কুমার মন্ডল,উলুবেড়িয়া রেঞ্জ অফিসার রাজেশ মুখার্জী , হাওড়া জেলা পরিষদের বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ মানস কুমার বসু, আমতা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মিত্র ,আমতা কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়ক সুকান্ত পাল, হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ এর সভাপতি সৌরেন্দ্র শেখর বিশ্বাস ,সম্পাদিকা কল্যানী পালুই , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেছোবিড়াল গবেষক সম্রাট চক্রবর্তী, সংসদ প্রতিনিধি তাপস বাকুলী, গাজীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান চন্দনা চোঙ্গদার ও আমতা থানার আধিকারিক সমাপ্তি রায় হাজির থেকে কবাডি খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিলেন।

এখন আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে কী এই রাজ্য প্রাণী, মেছো বিড়াল? কেন এই বিড়াল রাজ্য প্রাণী? চলুন আজ আমরা জেনে নিই এই বিড়াল সম্বন্ধে। আমরা জানি বিড়াল সাধারণত জলকে ভয় পায়। কিন্তু জলই এই বিড়ালের বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। বলা ভাল প্রধান শর্ত। এরা জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। মেছো বিড়াল জলে ডুব দিয়ে তলা থেকে বড় বড় মাছ শিকার করে। দেড় বা দু কেজির মাছ তুলে আনা এদের কাছে নস্যি। এরা বিশ্বের একমাত্র বিড়াল প্রজাতি যারা জলের মধ্যে এভাবে শিকার করে। জলাজমি এদের বিচরণ ক্ষেত্র। জলা জমিতে শিল্প, জলা ভরাট বা জলাজমি নষ্ট হওয়ায় এরাও হয়ে পড়ছে বিপন্ন। এরা মাছ ছাড়াও কীট পতঙ্গ, ব্যাঙ ও সাপ খেয়ে পরোক্ষে চাষির উপকারই করে।

 


এদের বিজ্ঞান সম্মত নাম প্রিয়োনাইলুরাস ভাইভারিনাস। বাংলায় এদের অনেক নাম বাঘরোল, মাছবাঘা, গোবাঘা, মেছো বিড়াল। এদের আকার সাধারণ বিড়ালের থেকে অনেকটাই বড় হওয়ায় এদের অনেকেই বাঘ বলে ভুল করেন। বাঘরোল নাম জনপ্রিয় হবার কারনেও অনেকে এদের বাঘের সঙ্গে গুলিয়ে আতঙ্কিত হন। বলতে দ্বিধা নেই চাকরি করার সময়ে দেখেছি মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার অনেক বড় বড় অভিজ্ঞ সাংবাদিকদেরও এদের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেই। আর তার ফলেই এদের দেখা গেলেই টিভি চ্যানেল গুলোতে হালচাল পড়ে। হেডলাইন হয়, ব্রেকিং নিউজ হয়- ‘অজানা প্রাণীর আতঙ্ক’। এদের বেঁচে থাকা আরও বিপদ সংকুল হয়ে পড়ে সৌজন্যে ‘অশিক্ষিত’ গণমাধ্যম! এই ধরনের হেডলাইনের বিরুদ্ধে আমি আগেও বহুবার সরব হয়েছি। আবারও হলাম। মাননীয় নিউজ প্রোডিউসার আপনি জানেন না যখন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপককে ফুটেজ দেখান, তিনিই আইডেন্টিফাই করে দেবেন প্রাণিটির নাম। নইলে সময় কম থাকলে গুগল লেন্সে ফেলুন। উত্তর পাবেন। আপনার অজ্ঞতা মানেই কোনও প্রাণী অজানা হতে পারে না।

 


যাই হোক মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে আসছি, আবেগপ্রবণ হয়ে। ফিরি ফিশিং ক্যাটের গল্পে। হ্যাঁ গল্পই তো। এদের সংখ্যা যেভাবে কমছে, এদের সম্বন্ধে না জানলে আগামিদিনে এদের স্থান হবে গল্পের পাতায়। তাই চিনুন এদের। এরা ধৈর্যশীল শিকারি। একটা মাছ শিকারের জন্য এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলের ধারে বসে থাকে। আর এতেই এরা মানুষের রোষে পড়ে। অথচ এরা মানুষের প্রতি মোটেই আক্রমণাত্মক নয়। সংরক্ষণের নিরিখে এরা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সমকক্ষ অর্থাৎ IUCN লাল তালিকাভুক্ত। মানে অতি সংবেদনশীল বিপন্ন প্রজাতির। আমাদের রাজ্যের রাজ্যপ্রাণী এই বিড়াল। ফেব্রুয়ারি মাস এদের জন্য সচেতনতা প্রসারের উদ্দেশ্যে বিশ্ব জুড়ে পালিত হয়। কেননা ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়াও এদের দেখা যায়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত জলাভুমিতে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশে। আর আমাদের রাজ্যে এদের আবাস হাওড়া, হুগলী, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুরের জলাজমিতে। সম্প্রতি পুরুলিয়াতেও বাঘরোল দেখা গেছে বন বিভাগের ট্র্যাপ ক্যামেরায়। মাছে ভাতে বাঙালির রাজকীয় রোল মডেল বা রাজ্যপ্রাণী এরা ছাড়া আর কেই বা হতে পারে! এদের চিনুন এদের সম্বন্ধে সঠিক বিজ্ঞানসম্মত তথ্যই এদের বাঁচাতে পারে। মানুষের সঙ্গেই এরা এদের বাসস্থান ভাগাভাগি করে নেয় বলে অভয়ারণ্য বা স্যাঙ্কচুয়ারি করে এদের সংরক্ষণ প্রায় অসম্ভব। কথাটা আমি বলছি না, একসময়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির সময়ে এই কথা আমাকে বলেন রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল, ওয়াইল্ড লাইফ, আইএফএস, শ্রী দেবল রায় মহাশয়।    

 

এদের সংখ্যা রোজ কমছে। দ্রুত কমছে। এদের মৃত্যুর কারণ রোড কিল ও মানুষের সঙ্গে সংঘাত। এই কবাডি প্রতিযোগিতার শেষে হাওড়া বন দফতরের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয় রাস্তায় দেওয়া হবে সাইনেজ। যেসব জায়গা মেছো বিড়ালের পারাপারের করিডোর সেখানে বন দফতরের পক্ষ থেকে লাগানো হবে রোড সাইন।    

Wednesday, September 1, 2021

প্রাণঘাতী শিরোনাম সংরক্ষণের জন্য ঘাতক


গত সোমবার লেখা আমাকে বাঘা বোলো না ব্লগটা শুরুতেই একবার চোখ বুলিয়ে নিন কারণ এই পোস্টটা ওটার সঙ্গেই সম্পর্কিত। হাওড়ার ওই অঞ্চলে বাঘরোল সাইটিং(Sighting ) হওয়ার পর থেকেই। এলাকায় একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। যে ঘটনায় মানুষের খুশি হওয়ার কথা ছিল তাতেই তাঁরা আতঙ্কিত! বহুকাল ধরে এই এলাকাগুলো বাঘরোলের প্রাকৃতিক হ্যাবিট্যাট(Habitat)। অর্থাৎ স্থানীয় ইতিহাস বলছে বন্যপ্রান আর মানুষের সহাবস্থান ওই এলাকায় যুগ যুগ ধরে রয়েছে। সংঘাত হয় নি।

তাহলে এখন কেন হচ্ছে? প্রথমত এর জন্য দায়ী অশিক্ষা। এই অশিক্ষা বলতে আমি কোনও স্কুল কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার কথা বলছি না। প্রকৃতি লব্ধ জ্ঞান। তলানিতে এসে পৌঁছেছে আমাদের। প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে যোগ কমে যাচ্ছে আমাদের। ফলত আমরা জানি না কোনটা কী। আমাদের চারপাশে কী আছে, যার সঙ্গে যাদের সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগ যুগ যুগান্ত ধরে! 

ইন্টারনেটের গণতান্ত্রিকতা আমদের সুবিধা দিয়েছে ইনফরমেশন খোঁজার। একই সঙ্গে ইন্টারনেট অশিক্ষা ছড়ানোরও একটা উত্তম মাধ্যম। আপনার হাতে ডেটা আছে, মোবাইলে বাই ডিফল্ট একটা ক্যামেরা আছে যাতে ফোটো ও ভিডিও রেকর্ড হয়। অতএব মনের মাধুরী মিশায়ে তাহারে করুন রচনা!! 

এই কথা লেখার কারণ ওই দুটি গ্রামের মানুষকে "অজানা জন্তু" সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য দেওয়ার বদলে কিছু ইউটিউব মিডিয়া এলাকায় গিয়ে যা করলেন সেটাকে আর যাই হোক সাংবাদিকতা বলা যায় না। বন্যপ্রান সম্বন্ধে কাজ করতে গেলে প্রতিবেদন বিজ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত। বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে থাকে প্রাথমিক ৩ শর্তের ওপর পরীক্ষা, নিরীক্ষা এবং সিদ্ধান্ত। বন্যপ্রানের প্রতিবেদনও তাই হওয়া উচিত। এটা আমার মত। এবং আমার এই ধারণা তৈরি হয়েছে বর্তমান পৃথিবীতে হার্ডকোর ওয়াইল্ড লাইফ কভারেজ অনুধাবন করে। এটাই হওয়া উচিত। এটা একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড রীতি। 

সংরক্ষণ কর্মীরা প্রায়ই বলে থাকেন বন্য প্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে "মশলা" খবর বা " Sensational News" প্রাণঘাতী। সংরক্ষণের জন্য মারাত্মকও বটে। এক্ষেত্রে ওই গ্রাম গুলির মানুষ আতঙ্কিত। তাঁদের কাছে যাবার আগে অল্প একটু পড়াশোনা করতেই পারতেন সংবাদ কর্মীরা। বাঘ আর বাঘরোলের তফাতটা নিজে জানতেই পারতেন। তা না করে তাঁরা যেটা করলেন তা হল কেবল উত্তেজনা ক্যামেরাবন্দী করে সেই উত্তেজনাটিকেই আরও বাড়ালেন। এরপর গ্রামবাসীরা যদি নিরীহ ফিশিং ক্যাটটিকে বাঘ বা অজানা প্রাণী ভেবে আতঙ্কে, ভয়ে পিটিয়ে মারে তার দায় কে নেবে? 

একদিকে রাজ্যপ্রাণীটিকে নিয়ে নেই সরকারি মন্ত্রক স্তরে সচেতনতা প্রসারের উদ্যোগ, কম সুবিধাপ্রাপ্ত বন দপ্তরের কর্মী (অনেকটা ঢাল তরোয়াল বিহীন কেবল মনের জোর সর্বস্ব নিধিরাম সরদার ) আর কিছু বন্যপ্রান সংগঠন (যাঁদের ফান্ড নেই আছে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর উদ্যোগ), এই নিয়ে সংরক্ষণ (পড়ুন মোকাবিলা) চলছে আমাদের রাজ্য প্রাণীটিকে বাঁচানোর। IUCN তালিকায় যে লাল। মানে অবলুপ্তির প্রহর গুনছে। উল্টোদিকে সীমাহীন অশিক্ষা। 

Monday, August 30, 2021

আমাকে বাঘা বোলো না !



গতকাল দেরি করে বাড়ি ফিরেছি অফিস থেকে। বাইকটা তখনও থামে নি। ঘনঘন ফোন আসছিল। মোটর সাইকেল চালালে সাধারণত ফোন ধরি না। তাই বাড়ি পৌঁছে পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম। দেখলাম গ্রামীণ হাওড়ার একজন নেচার অ্যাক্টিভিস্টের ৩টে মিসড কল। আমাকে না পেয়ে তিনি মেসেজ করেছেন, "ডোমজুড়ের করলায় বাঘের আতঙ্ক ছড়িয়েছে" মেসেজের নীচে একটা ভিডিও ক্লিপ। আবার তার নীচে আর একটা মেসেজ সহ ভিডিও "পাঁচলা বেলডুবিতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে"। আতঙ্ক মানুষজনের এমন অবস্থা তাঁরা ভয়ে পিটিয়েও মারতে পারেন প্রাণীটিকে। সেই অ্যাক্টিভিস্টকে ফোন করলাম। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আমাদের রাজ্য প্রাণী ফিশিং ক্যাট (State Animal of West Bengal Fishing Cat )বা বাঘরোল। বন্ধুটিও সহমত। কিন্তু গ্রামবাসীদের বোঝায় কার সাধ্য! আগ বাড়িয়ে তাঁকে বললাম "আমাকে ওনাদের নম্বর দাও, কথা বলব"। আমার পাঁচ বছরের কন্যা সারাদিন পর বাবার দেখা পেয়ে তিড়িং বিড়িং করছে ফড়িং এর মত। তাকে বললাম, "মা একটা গুল্লু বাঘরোলকে দেখে সবাই বাঘ বলে ভয় পেয়েছে! ওঁদের সঙ্গে কথা বলে তোমার সঙ্গে খেলব। নইলে সোনাবাবাটাকে ওঁরা ভয় পেয়ে মেরে ফেলবে"। ও বলল, "কেন মারবে? ওরা তো ভাল"! 

সময় নষ্ট না করে প্রথম ফোন করলাম সমীর মল্লিককে। ওনার বাড়ির দাওয়ায় ঘুরেফিরে বেড়িয়েছে পূর্ণ বয়স্ক ফিশিং ক্যাট, রাতের অন্ধকারে। সিসিটিভি ক্যামেরায় পরিষ্কার ছবি এসেছে। উনি নিশ্চিত ওটা 'বাঘ' জাতীয় কিছু। মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোঝাতে লাগলাম। ওই এলাকায় কোনও মতেই বাঘ আসতে পারে না। মাথার ভিতরে চলছিল -আজ থেকে ২০০ বছর আগে পার্ক স্ট্রিটেও বাঘ ডাকতো,আমরা এতই বুভুক্ষু যে সব খেয়ে ফেলেছি, উন্নয়ন আর নগরায়নের জোড়া চোয়াল দিয়ে চেবাতে চেবাতে এখন জিভটুকুই অবশিষ্ট পড়ে আছে। সমীর বাবুর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে বাঘরোল নিয়ে করা আমার ভিডিও প্রতিবেদনের লিঙ্ক পাঠালাম। বললাম খেয়াল রাখুন প্রাণীটার। ওরা নিরীহ, মৎস্যভুক, লাজুক প্রকৃতির প্রাণী। সাধারণতঃ নিশাচর। উপায় না পেয়ে, বাসস্থান আর খাবারের সংকট দেখা দিলেই তবে লোকালয়ে আসে। ওটাকে মারবেন না। ও যে আমাদের রাজ্যপ্রাণী! পৃথিবীতে রোজ কমছে ওদের সংখ্যা। 

এরপর ফোনে ধরলাম আর এক আতঙ্কিত মানুষ লেনিন বসুকে। তাঁকেও বোঝালাম বললাম। তিনি আজও ফোন করেছিলেন। তাঁদের গ্রামে বন দপ্তর থেকে বন কর্মীরা এসে খাঁচা পেতে দিয়ে গেছেন। ওখানে গতকাল একটা পুকুর পাড়ে মাছের আশায় এসেছিল বাঘরোল। গ্রামের মানুষরা স্বস্তি পেয়েছেন। 
বাঘরোল সম্পর্কে ২টি কথা 

১
আইএউসিএন লাল তালিকায় সংরক্ষণের নিরিখে অতি সংবেদনশীল আমাদের রাজ্যপ্রাণী- বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাট। ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক ভাবে ফিশিং ক্যাট ফেব্রুয়ারি হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। বাঘরোল, একমাত্র বৃহৎ মার্জার প্রাণী যা জলে ডুবে তার শিকার ধরে। বেড়াল জাতীয় প্রাণী সাধারণত জল এড়িয়ে চলে। অথচ এই বেড়ালের বেঁচে থাকার জন্য জলই হল অন্যতম শর্ত। এদের গায়ে লোমের দুটি পরত এবং অন্য বিড়ালদের তুলনায় দুটি চোখ কাছাকাছি হওয়ায় এদের শরীরের গঠনতন্ত্র আন্ডারওয়াটার হান্টিং এর জন্য অনুকূল। 

২ 
একদিকে উন্নয়ন, কৃষি আর নিবিড় মৎস্যচাষের জন্য রোজই ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক জলাজমি। ফল স্বরূপ বাসস্থান আর খাদ্যের সংকটে পড়ছে বাঘরোল। প্রতি বছর ৩০% হারে হু হু করে কমছে ওদের সংখ্যা।  ওদের আবাসের ৯০% ই লোকালয় সংলগ্ন। আর অন্যদিকে ওদের সম্পর্কে নেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা। তাই ওদের বাঁচাতে গেলে মানুষের সাথে বাঘরোলের সহাবস্থান অত্যন্ত জরুরী।  পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, আর উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাওয়া যায় ওদের। জলাভুমির বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। সে বাঁচলে তবেই ভারসাম্য রক্ষা হবে একটা বড়সড় ইকো সিস্টেমের।  তাই বাঘরোল সংরক্ষণের বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে স্থানীয় যারা নেচার অ্যাক্টিভিস্ট তাঁরা তাঁদের সীমিত সামর্থে যতাটা পারছেন অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। কিন্তু সরকারী দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যাঁরা, মানে বন মন্ত্রকের তরফে সচেতনতা কোথায়? কোথায় হোর্ডিং-এ, ব্যানারে, কাগজে, টেলিভিশনে মানুষকে সচেতন করা অ্যাড ? যেসব জায়গায় বাঘরোলের বাসস্থান সেখানে কি  বন মন্ত্রক থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সচেতনতা ছড়ানো হয়ে থাকে? মন্ত্রকের বরাদ্দ খাতের অর্থগুলো তাহলে ব্যবহৃত হয় কোন খাতে? এ প্রশ্নটা তো উঠবেই। স্থানীয় মানুষ বাঘ আর বাঘরোলের তফাৎ করতে পারছেন না মানে বন মন্ত্রকের তরফ এ কোনরকম উদ্যোগই নেই কি এলাকাগুলোয়? প্রশ্নটা তো উঠবেই। আর উত্তর কোনও কিছু আসবে না তাও জানা। তবুও প্রশ্নগুলো তোলা রইল। কেবলমাত্র ফিশিং ক্যাট ফেব্রুয়ারিতে পোস্টার ছাপিয়ে "সেভ ফিশিং ক্যাট" বললাম; আর বাকি সময়ে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর খুব কম সুবিধাপ্রাপ্ত বন বিভাগের কাঁধে দায় ঝেড়ে ফেলে দিলাম। এ কোন পথে হাঁটছে আমাদের রাজ্যের রাজ্যপ্রানীটির সংরক্ষণের চালচিত্র? কারণ সংরক্ষণ একটি লাগাতার প্রক্রিয়া আর তাতে হাল ছেড়ে দিলেই বিপদ! শুধু প্রাণীটিরই নয় মানুষেরও।  


বাঘরোল সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে