Showing posts with label satyajit ray. Show all posts
Showing posts with label satyajit ray. Show all posts

Tuesday, August 6, 2024

পরিচারিকা থেকে কলকাতার 'রাতের রাণী- মিস শেফালি' হয়ে ওঠার অবিশ্বাস্য কাহিনী



রাতের কলকাতা। এক রহস্যময়, আলো আঁধারে ঘেরা। আজ আপনাদের সামনে অতীত কলকাতার প্রথম ক্যাবারে কুইনের গল্প। অনেক প্রশ্ন আর রহস্যের মাঝে শেষ রাতের শিউলি ফুলের মতো ফুটে ছিলেন সেই নিশি সম্রাজ্ঞী। আজ মিস শেফালির গল্প। 

তখনও দেশভাগ হয়নি। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতার আহিরিটোলায় এসেছিলেন দাস পরিবার। সেই পরিবারের তৃতীয় সন্তান একটি মেয়ে। নাম আরতি দাস। বাবা অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। এদেশে আসবার সময়ে সামান্য যা কিছু সঞ্চয় ছিল তাও নিঃশেষিত হয়েছে। পরিবারের মুখে অন্নের যোগান তুলে দিতে আরতির মা গার্হস্থ সহায়কের কাজ নিলেন। বাড়িতে অনেকগুলো মুখ। রোজগার নিতান্তই কম! তাই কিশোরী আরতি বাধ্য হয়ে এক রকম জোর করেই চৌরঙ্গীর এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারে কাজের মেয়ে হিসাবে নিযুক্ত হল। আর সেখান থেকেই মোড় ঘুরে গেল আরতির। আরতি থেকে মিস শেফালি। কলকাতার প্রথম ক্যাবারে কুইন হয়ে ওঠার সেই উপাখ্যান আজ। 



মিস শেফালি একবার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক অনির্বাণ চৌধুরীকে তাঁর উত্থানের গল্প বলেছিলেন। কী বলেছিলেন সেদিন ক্যাবারে কুইন? 

মিস শেফালি তাঁর জীবদ্দশায় সেই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- 

'অনেক নদী, নালা, কাদা পেরিয়ে হিমালয় দেখেছি। বাবার কষ্ট, ভাইয়ের কান্না, দেখেছি। ১০ সাড়ে দশ বছর বয়সে আহিরিটোলার বানী নামের এক মহিলাকে জোরাজুরি করতাম কাজ দাও কাজ দাও। সে একটা কাজ দিল। মায়ের অনুমতি নিয়ে বাণী আমাকে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাড়িতে নিয়ে যায়। প্লেট ধোয়ার কাজ। সেখানে রোজ বিকেলে খানাপিনা ও নাচের আসর বসত।' 



দেখে দেখে সেই নাচের ঘোর লেগে যায় আরতির চোখে আরতির মনে। লুকিয়ে লুকিয়ে সে সব নাচ তুলতে থাকেন আরতি। তখন সে নিতান্তই বালিকা। ওই আসরে গান গাইতে আসতেন ভিভিয়েন হ্যানসাম। তখনকার কলকাতার পানশালার ডাকসাইটে গায়ক। আরতি ভিভিয়েনকে ধরেন একটা কোনও কাজের জন্য। ভিভিয়েন প্রশ্ন করেন নাচতে পার? আরতি তাঁর গোপনে দেখে নকল করা নাচ দেখান। পানশালায় নর্তকীর কাজ জুটিয়ে দেন ভিভিয়েন। 

ভিভিয়েন আরতিকে প্রথমে নিয়ে যান গ্র্যান্ড হোটেলে। তারপর গ্র্যান্ড থেকে বার করে ভিভিয়েন আরতিকে নিয়ে যান ফিরপোজে। আরতির নাচ পছন্দ হয় ফিরপোজের ম্যানেজারের। কিন্তু ম্যানেজার বলেন এই নাম চলবে না। ভিভিয়েন বলেন আজ থেকে তোমার নাম আরতি দাস নয় । আজ থেকে তোমার নাম শেফালি। তোমার বেতন ৭০০ টাকা। আরতি জিজ্ঞেস করেন 'আবার বলুন কত বেতন!' নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না উদ্বাস্তু পরিবারের সেই অভাবী মেয়েটা। 

তবে প্রথম দিনের পরিধেয় পোশাক দেখে কেঁদে ফেলেন সদ্য আরতি থেকে মিস শেফালী হওয়া সেই কিশোরী। সেই পোশাকে যে শরীরের অনেকটাই হয়ে পড়ছিল উন্মুক্ত। বেআব্রু। তবে বল রুমে প্রথম নাচের আসরেই মাতিয়ে দেন তিনি। প্রশংসা আর হাততালিতে ফেটে পড়ে নিশি আসর। 

ফিরপোজও যেন চাইছিল ক্যাবারের নতুন রানীকে গড়ে পিঠে তৈরি করে নিতে। তারাই আরতিকে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় কথাবলা শেখায়। নাচের বিভিন্ন রকমের তালিম দেয়। সেই সময়কার পার্ক স্ট্রীট অন্যরকম। ব্রিটিশরা তখনও শহরে। আরতি সেই সাক্ষাৎকারেই বলেন "লুকিয়ে চুরিয়ে স্ট্রিপটিজ হতো পার্ক স্ট্রিটের পানশালা আর নিশিনিলয়গুলিতে"। যদিও তাঁর কাছে এমন প্রস্তাব কখনও আসেনি। তখন তিনি খ্যাতির শিখরে উঠছেন। তাঁর এক ঝলক পেতে শহরের সন্ধ্যাগুলো উদ্বেল। 'তোমাকে ভালবাসি , তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, তোমাকে বিয়ে করতে চাই'। এমন প্রস্তাব আসত অহরহ। তিনি জানতেন এসব যৌবনের ঘোর। এ ঘোর চিরস্থায়ী নয়। তাই ওসব খুব একটা পাত্তা দিতেন না। 



সেই সময়ে কিছুদিন ধরে কেউ একটা ফোন করছিল। শেফালি ভেবেছিলেন তাঁর বহু অনুরাগীর মধ্যে কেউ বুঝি ফোন করছেন। শেষমেশ বাধ্য হয়েই একদিন ফোন ধরলেন শেফালি। ফোনটা ধরতে ফোনের ওপার থেকে শোনা গেল, "তুমি হয়ত আমার নাম শুনলেও শুনতে পার আমি সত্যজিৎ রায় বলছি। আমার তোমাকে চাই"। ২০ সার্কাস অ্যাভেনিউ থেকে গেলেন বিশপ লেফ্রয় রোড। সত্যজিৎ বলেছিলেন তোমার ব্লাউজ খুলতে অসুবিধে আছে? তুমি কি সিগারেট খাও? এক সাক্ষাৎকারে শেফালি শোনান প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির শুটের সেই অভিজ্ঞতা-  

"আমি তো আগে কখনও করিনি। ডায়লগ বলতে গেছি। অমনি শুনলাম 'কাট'। স্ক্রিপ্টটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। আমি তো ভয় পেয়ে গেছি। সত্যজিৎ তখন বলেন তোমার স্ক্রিপ্ট আমি এখানেই করে নেব"। 

বাঙালির ম্যাটিনি আইডল উত্তম কুমারকেও নাচিয়ে ছেড়েছিলেন মিস শেফালি। একবার উত্তম কুমার তাঁর নাচ দেখতে এসেছিলেন। এপ্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে মিস শেফালি বলেন। 'সুযোগ পেলাম। উত্তম কুমারের সঙ্গে নাচার সুযোগ। মনে মনে বললাম তুমি উত্তম কুমার, আমিও মিস শেফালি। তোমাকে আমি আজ নাচাচ্ছি।' উত্তমকুমারকে দাদার মতো ভালবাসতেন মিস শেফালি। সুচিত্রা সেনের অভিনয়ের দারুণ ভক্ত ছিলেন কলকাতার ক্যাবারে কুইন। সুচিত্রা মিস শেফালির নাটক 'সম্রাট সুন্দরী' দেখতে আসেন একবার।    



আজীবন মুম্বইয়ের হেলেনকে নিজের গুরু মানতেন। একলব্য যেমন গুরু দ্রোণকে গুরু মানতেন তেমনি। তাই হেলেনের সঙ্গে শো করতে চাননি কখনও। 

কখনও সখনও মনে হয়েছে মিস থেকে মিসেস হয়ে যেতে। কিন্তু সেই মনে হওয়া সেই ইচ্ছেকে কখনও আমল দেননি। কারন তিনি জানতেন আজ যে পুরুষ তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে সে একদিন ছেড়ে চলে যাবেই। বরং তিনি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছেন আরতি দাসের হাতটাই। যে আজীবন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছায়া হয়ে থেকেছিল।

কোনোদিন শিল্পীর সম্মান জোটেনি মিস শেফালিদের। মুখ থেকে লাইমলাইট থেকে সরে যাওয়ার পর  আর পাঁচটা সাদামাটা

মহিলার মতো জীবন কাটাতেন। হতাশ আরতি দাস মনে করতেন, ক্যাবারে ডান্সারদের শিল্পসত্ত্বা নিয়ে কেউ কোনও দিন কথা বলেননি। কাজ না থাকায় শেষ জীবনে আর্থিক সমস্যারও সম্মুখীন হয়েছেন । অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্যেও অর্থাভাব হয়। দীর্ঘদিন কিডনির অসুখে ভুগে। অবশেষে ২০২০সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মিস শেফালি পাড়ি দেন তারাদের দেশে। তাঁর আত্মজীবনী 'সন্ধ্যা রাতের শেফালি’ পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলে। এই পার্ক স্ট্রিট থেকে উত্থান আর এক সিঙ্গারের। তিনি পদ্মভূষণ প্রাপক ঊষা উত্থুপ। অথচ আরতি দাস ওরফে মিস শেফালিরা থেকে যান ক্যাবারে কুইনের মতো এক প্রশ্ন সূচক তকমা নিয়েই। আপনাদের কী মত এই প্রসঙ্গে? কমেন্টে জানান। আর এই বিষয়ের ওপরে আমার  তৈরি একটি ভিডিও দেখুন নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে। 



 

Tuesday, May 1, 2018

নন্দন, সত্যজিৎ ও প্রদীপ | The Sculptors who crafted the logo of NANDAN Designed by RAY

 সম্প্রতি ভারতীয় পেন্টিং ও স্কাল্পচার নিয়ে একটা কাজ করছি। প্রায় ১৬ -১৭ জন শিল্পীদের নিয়ে কাজ। প্রত্যেকের ওপর টুকটাক পড়াশোনা, তাদের কাজের ধরনের খুঁটিনাটি নিয়ে একটু রিসার্চ করে শ্যুট শুরু করলাম। চন্দননগরে পরিচয় হল শ্রী প্রদীপ সুরের সাথে। সদা আলাপি হাস্যময় প্রদীপ বাবু থেকে প্রদীপ দা হয়ে উঠতে সময় নেন খুব কম।  রঁদ্যার কাজের প্রদর্শনী দেখে যৌবনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন প্রদীপ দা।  বিশ্বাস করেন শিল্প যদি সমাজ গ্রহণ করে তখন বুঝতে হবে সেই শিল্পের আর্ট থেকে ফাইন আর্টে উত্তরণ ঘটছে। আমরা যারা ভাবি শিল্পীর বেসিক কাজই একমাত্র ফাইন আর্ট ; প্রদীপ সুরের ভাবনা তাদের  সেই বোধকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন " রঁদ্যা তাঁর জীবনে যা কাজ করেছেন সবই অর্ডারী কাজ বা ওজুরার কাজ। কিন্তু তার শৈল্পিক মূল্য কোনও মতেই কম না। অর্থাৎ আমি একটা স্কাল্পচারই করি বা বিয়ের পিঁড়েই আঁকি সবই আসলে আমার শৈল্পিক মূল্যবোধের বিচ্ছুরণের মাধ্যম। সবই আসলে আমারই কাজ। তাই সবটাই সমান গুরুত্ত্ব দিয়ে করতে হবে। " ওনাদের শিল্পীদলের নাম কন্ট্রাইভ্যান্স। আগামী ১০ তারিখ থেকে লন্ডনের লা দেম আর্ট গ্যালারি তে ওঁদের প্রদর্শনীর আয়োজন করছে Abundant Art Gallery । সেই নিয়েই আমাদের কাজ চলছিল। প্রাণবন্ত প্রদীপদা সারা শ্যুট জুড়ে ছটফটে। যেন ইউনিটের সবচেয়ে ছোট বাচ্চা। সাউন্ড টেক হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রদীপ দার গলা। কাট কাট। ও প্রদীপদা চুপ করুন।
এরকমই মানুষ টা। অথচ পশ্চিমবাংলার ফিল্ম ও সংস্কৃতির পীঠস্থান নন্দনের লোগো ওনার বানানো !!!





হ্যাঁ, সময়টা আশির দশকের শেষভাগ, সত্যজিৎ রায়ের পরিকল্পনায় তৈরী হচ্ছে নন্দন। লোগো ডিজাইনের কাজ করে ফেলেছেন সত্যজিৎ। স্টিলের বিশালাকার লোগো তৈরির জন্য খোঁজা হচ্ছে ভাস্কর। প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা চিফ ইঞ্জিনিয়ার আর্ট কলেজের পাস আউটদের খুঁজছেন এই কাজের জন্য। এখনকার স্টলওয়ার্ট বিকাশ মুখোপাধ্যায় ,মহি পাল ও প্রদীপ সুরেরা তখন তরুণ,সবে বেরিয়েছেন আর্ট কলেজ থেকে। তাঁরা তৈরী করেছেন ইউনাইটেড ডিজাইনার নামের কোম্পানি। নন্দনের চিফ ইঞ্জিনিয়ার যোগাযোগ করলেন তাঁদের সাথে। ইউনাইটেড ডিজাইনারের তরফ থেকে প্রদীপ, ইঞ্জিনিয়ারকে পরামর্শ দিলেন লোগোটা স্টিলের না করে ফাইবার গ্লাসে করবার। রায় বাবুর মুখের ওপর কথা বলার সাহস নেই জানিয়ে দিলেন অভিজ্ঞ বাস্তুকার। তরুণ প্রদীপ সত্যজিতের সাথে একটিবার আলাপ করিয়ে দিতে বললেন  চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে। সেইমত মিটিং ফিক্স হল। প্রদীপের যুক্তি মন দিয়ে শুনলেন সত্যজিৎ। একটা ছোট রেপ্লিকা দেখতে চান তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন জানালেন নন্দনের রূপকার। কিছুদিনের মধ্যে লোগোর ডিজাইনেরই দেড় ফুট ব্যসের একটা 'ন' এর ক্ষুদ্র সংস্করণ নিয়ে প্রদীপরা হাজির হলেন বিশপ লেফ্রয় রোডে। পছন্দ হল সত্যজিতের। হালকা সংশোধন দিলেন অস্কার জয়ী পরিচালক। "ব্রাশের দাগ গুলো যেন না থাকে " তৈরি হল নন্দনের ১০ ফুট ব্যসের লোগো।

আজ প্রদীপ , বিকাশ, ও মহি বাবুর বয়সে সময়ের ছাপ। মনের বয়স যদিও তরুণ। একাডেমি নন্দন চত্বরে আসেনও মাঝেমাঝে প্রদীপ সুর। কোথাও কি নস্টালজিয়ায় ভোগেন তিনি ? নাকি ভাবেন প্রতিটি কাজ ই আসলে প্রাকটিস। আর নিজেই মনে মনে হাসেন, নিজের পুরোনো কাজ দেখে।  ভাবেন স্রষ্ঠার কাজই হল চরম যত্ন সহকারে পরম মমতায় অপরের কাজকে নিজের করে তৈরি করা। তারপর তাকে ভুলে যাওয়া। হেঁটে চলা আগামীর দিকে।

Friday, March 23, 2018

পথেই হবে এ পাত চেনা

সত্যজিৎ রায়ের আত্মজীবনীমূলক লেখা যখন ছোট ছিলাম অনেকেরই পড়া। সত্যজিতের ছোট কাকা সম্ভবত সুবিনয় রায় ছিলেন ভোজন রসিক ও বিলাসী। মুখে খাবারের গ্রাস নিয়ে বত্রিশবার চিবোতেন। প্রতিটি খাবারের স্বাদ ডায়রিতে নোট রাখতেন। তো সেই বই তে তাঁর চা বিষয়ক একটি মজার লেখা আছে। মানে এক একরকম চা খেয়ে সেই চা দের চরিত্র বিশ্লেষণ। আগে সেটাই দেখি তারপর মূল লেখায় আসছি।
সত্যজিৎ বলছেন
" ছোটকাকা পেটুক না হলেও খেতেন খুব তৃপ্তি করে। রোজ এবারই ওবাড়ি গিয়ে চা খাওয়ার ব্যাপারটা  ছিল একটা বিশেষ ঘটনা। ডায়রিতে এর উল্লেখ থাকত , তবে মামুলিভাবে নয়। যে চা -টা খেলেন তার একটা বিশেষণ , আর ব্রাকেটের মধ্যে সেই বিশেষণের একটা ব্যাখ্যা চাই। 
একমাসের ডায়রি থেকে বারোটা উদাহরণ দিচ্ছি। ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে --

১) নৃসিংহভোগ্য চা (ভৈরবকান্তি-জনক ,হুহুঙ্কার প্রসাদক ,জোরালো চা )
২) বৈষ্ণবভোগ্য চা (নিরীহ , সুমিষ্ট , সুকোমল ,অহিংসক চা )
৩) বিবেকানন্দভোগ্য চা ( কর্মযোগস্পৃহাবর্ধক , বাগবিভূতিপ্রদ , তত্ত্বনিষ্ঠার অনুকূল উপাদেয় চা )
৪) ভট্টাচার্যভোগ্য চা ( বিজ্ঞতাবর্ধক ,গাম্ভীর্যপ্রদ , অনুগ্র ,হৃদ্য চা )
৫) ধন্বন্তরিভোগ্য চা ( আরোগ্যবর্ধক ,আয়ুষ্য ,রসায়নগুণ-সম্পন্ন চা )
৬) পাহারাদারভোগ্য চা (সতর্কতাবর্ধক , উত্তেজক , তন্দ্রনাশক চা )
৭) মজলিসী চা (মসগুল-মসগুল ভাবোদ্রেককারী চা )
৮) কেরাণিভোগ্য চা ( হিসাবের খাতা দেখায় উৎসাহবর্ধক , বাদামী স্বাদু চা )
৯) হাবিলদারভোগ্য চা  ( হিম্মতপ্রদ , হামবড়াভাবের প্রবর্তক চা )
১০) জনসাধারণভোগ্য চা ( বৈশিষ্টহীন ,চলনসই চা )
১১) নারদভোগ্য চা ( সঙ্গীতানুরাগবর্ধক , তত্ত্বজ্ঞানপ্রসাদক , ভক্তি-রসোদ্দীপক চা
১২) হনুমানভোগ্য চা ( বিশ্বাসযোগ্যতাবর্ধক , সমস্যা-সমুদ্রলঙ্ঘনের শক্তিদায়ক , বিক্রমপ্রদ চা ) "


ছোট থেকে যতবার যখন ছোট ছিলাম পড়েছি এই জায়গায় এসে হাসি চাপতে পারি নি। কী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ !!! কাজেই চা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ওই লাইনগুলো আগে খেলে যায় মাথায়।
আজ আবার একটা পুরোনো প্রকাশিত লেখা দিচ্ছি। লেখাটা লিখে আরাম পেয়েছিলাম। হুবহু তুলে দিলাম

এক কাপ চায়ে আমি...
প্রকাশিত হয় হ্যাংলা হেঁশেল সংখ্যা ৩১ এ
বিভাগ : পথেই হবে পাত চেনা
প্রকাশকাল : মে ২০১৫




কোন পথে যে পাত পাড়া আর কোন পথে পাতকুয়ো তার জরিপ করতে করতেই জিন্দেগি পার হয়ে যায়। হু হু করে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা হয় বিমের আলোয় সরে যায় সময় ,নড়ে যায় গন্তব্য। গতি কমিয়ে আমার লো বিম অফ দিই। আসুন সময় , মেপে নিন আমায়। আমার সবটা দিয়ে থামালাম চাকাগুলো। এটাই আমার গন্তব্য ! সত্যিই কি তাই ? আসলে এখন যেটা গন্তব্য বলে ভাবছি দুদিন বাদে সেটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যাব অন্য আস্তানায়। এরই নাম জীবন , এটাই পথ। একটা পদক্ষেপ থেকে আর একটায় হেঁটে যাই , ভেসে যাই , উড়ে যাই। এ চলা অনন্ত অবিরাম। চলেছি , চলেছি চলেই চলেছি। চলতে চলতে চালাক হয়েছি কিনা জানি না চালু হয়েছি। ঠিক ওই রাস্তার পাশের অবহেলায় পড়ে থাকা চা-এর দোকানের মতো ভাঁড়ে মা ভবানী বা গরম চায়ের ছ্যাঁকা খেয়ে সূচের ছিদ্র খুঁজেছি। ছোটবেলায় বাড়িতে বাবা মা চা থেকে বহুদূরে হরলিক্স , ভিভা , বোর্নভিটা , মলটোভার কাপে কয়েদ করে রেখেছিল।  বোনকে তো এমন থ্রেট দেওয়া হয়েছিল যে ,'চা খেলে মা মরে যায় ' !! শৈশবের সেই শঙ্কা সারা জীবন আমার ছোট বোনকে নটি ( No Tea )-র দলে , মানে না-চা-র দলে রেখে দিল। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর কলেজ ক্যান্টিনের গোপালদার হাতে প্রথম স্বাদ পেলাম অমৃত পেয়ালার ! তারপর কত চলেছি আর ক্লান্তির প্রহরগুলোতে চার্জ আপ করেছে চা। এ এক অদ্ভুত পানীয়। শহর বা মফঃস্বলের তামাম আনন্দঘন মুহূর্ত থেকে স্বজনবিয়োগের অশ্রুসজল ব্যাথার প্রহর -- সবটা জুড়ে রয়েছে চা। কত শবের সঙ্গে শ্মশানযাত্রী হয়েছি। তার মধ্যে বেশিরভাগই পরিচিত বা আত্মীয়দের।  কিন্তু বিশ্বাস করুন ওই করুণ আবহতেও যখন দেখি বড় পিসেমশাই আর সেজ জ্যাঠার মধ্যে কে শ্মশানবন্ধুদের চা খাওয়াবে তাই নিয়ে হুড়োহুড়িটা রীতিমতো প্রতিযোগিতার পর্যায়ে চলে গেছে তখন অবাক হয়ে মৃত্যুর নির্মোক ছেড়ে জীবনমুখিতায় ফিরি। মৃতের ফুলমালা , খাট ,খৈ-এর দোকান গভীর রাতে খোলাতে হলেও বাজি ধরে বলতে পারি বারুইপুর থেকে বজবজ , বাটানগর থেকে ব্যারাকপুর বা আসানসোল থেকে আদ্দিস আবাবা শ্মশানের সামনের চায়ের দোকান খোলা থাকবেই। শুধু কলকাতা জুড়ে চা নিয়ে যে উন্মাদনা তা নিয়ে গোটা একটা বই লেখা হয়ে যেতে পারে। পার্ক স্ট্রিটে T3 ( The Tea Table) এখন নেই কিন্তু অক্সফোর্ড বুক স্টোরের ওপর চা-বার (CHA BAR) আর দক্ষিণাপনে প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ত্ব ডলি বসুর Doly's Tea চা বিলাসী কলকাতার পপুলার ডেস্টিনেশন।
ময়দানে অবসরের সান্ধ্য চা 

জলপাইগুড়ি থেকে জয়নগর কত হরিদা ,মানু ভাই , রায় জি ,পাঁড়ের হাতে যে চা খেয়েছি তার শেষ নেই। আর দোকানে যদি পুরুষের বদলে প্রৌঢ় মহিলা থাকেন তাহলে অনায়েসেই মাসির আপ্যায়নে প্রজাপতি ,লেড়ো বা মেরি বিস্কুটের সঙ্গে কাচের গ্লাসে বা মাটির ভাঁড়ে কত ঝোড়ো প্রহর ফুস করে উড়ে চলে যায়। বেকার বয়েসে আমাদের আড্ডা ছিল হরিদার দোকানে। অপরিসর, ম্লান আলোমাখা মফঃস্বল রেল শহরে চারটে বেঞ্চ অপেক্ষা করে থাকত আমাদের আড্ডার সাক্ষী হতে। শুক্রবার , শুক্রবার হাট বসত। আর হাট শেষ করে যখন হাটুরেরা বাড়ি ফিরত তখন ভাঁটিখানায় ভিড় বাড়ত। তারপর মাতালদের চিৎকারে কান পাতা দায় হত। একবার এক কপাল পর্যন্ত নেশা করা মাতাল কী কুক্ষণে যেন হাজির হল হরিদার দোকানে। আর যায় কোথায় !! সবাই মিলে সেই লোকটাকে সাত - আটটা ছানার জিলিপি আর চা বলে এক কাপ জিলিপির রস খাইয়ে ছাড়ল। ছাড়ল কোথায় ! চা ভেবে সেই রস খেয়ে সেই চাতালরূপী মাতাল মাঝরাত অবধি পড়ে রইল হরিদার দোকানের সামনে। পরে ভেবেছি এরকম প্রতারণা না করলেই বোধহয় ভাল হত। 
ক্যানিং স্ট্রিটের এক প্রাচীন টি বয়লার 
  ঘুম চোখে উঠে চা -এর চাহত এ আঁকুপাঁকু করত হো চি মিন সিটিতে। দুধ চা বিরল ভিয়েতনামে। চা বলতে যা পাওয়া যেত তা হলদেটে ঠান্ডা ট্যালটালে এক পানীয়। দিন ১৫র ভিয়েতনাম সফর শুধু ওই প-চা জিনিসটার জন্যই বিরস কেটেছিল। আমার চা নিয়ে আদিখ্যেতার জন্য আর এক চায়ের সঙ্গে পরিচয় হল লেহ শহরের বাইরে সে TSE তে ( এই সে তে 'দিল সে ' সিনেমার টাইটেল সং এর শুটিং হয়েছিল ) লবজুং নোমাঙ্গ এর বাড়িতে। শুধু চা এর জন্যই সে এক ঢালাও আয়োজন। গরম জল, নুন ,মাখন আর চা পাতার মিশ্রণ সুদৃশ্য বাঁশের খোলে পিস্টনের ওপর নিচ করে তৈরি হয় গুটিগুটি চায়ে বা গুড়গুড়ি চায়ে। পোর্সেলিনের নক্সা করা পেয়ালায় সুন্দর তিব্বতি টুলে রাখা টিকোজি ঢাকা পিরিচ থেকে সেই চা ঢালতে ঢালতে বাদশাহী মেজাজ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারির নলেন গুড়ের দার্জিলিং চা 
 এরকমই চলার পথে একটা  ঘটনা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা। তখন আমি মেদিনীপুরে। একটি বেসরকারি ন্যাশনাল চ্যানেলের চিত্রগ্রাহক। ছোট আঙারিয়া কাণ্ডের সপ্তাহখানেকের মধ্যে নির্বাচনী আধিকারিকরা গ্রামে ঢুকছেন , সাথে আমরাও। লোকজন ক্যামেরা দেখে দৌড়ে পালাচ্ছে ঘরের ভিতর। পড়ে থাকছে ভাত ডাল মাখা থালা। এরকম অবস্থায় ছবি করে কাজ মিটিয়ে দেখি গ্রামের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট ঝুপড়ি। তার বারান্দায় একটা মাটির উনোন। বুঝতে বাকি রইল না ওটাই গ্রামের রাজনৈতিক মত বিনিময় কেন্দ্র -- চায়ের দোকান। হাঁকডাক করতে ভয় ভয় চোখে একজন বেরিয়ে এল। অনেক অনুরোধ , উপরোধ , অনুনয়, বিনয় করে ছবি না তোলার প্রতিশ্রুতি দিতে সে গুড়ের চা খাওয়ানোর আশ্বাস দিয়ে বলল - ' একটু আসি পাঁচ মিনিটেই ফিরব। ' পনেরো কুড়ি মিনিট পরে পাশের ঝোপ থেকে শুকনো কাঠকুটো এনে মাটির উনুন এ আঁচ দিয়ে , জলে গুড় মিশিয়ে  চা জাতীয় কিছু একটা সেই মিশ্রনে ফুটিয়ে গ্লাসে ছেঁকে দিয়ে বলল - "বাবু কবে সব ঠিক হবে ?" উত্তরটা দিতে পারিনি। অনেক কিছুই করা হয় নি। জানা হয়নি। রাখা হয় নি অনেক প্রতিশ্রুতিই। কাপ আর ঠোঁটের ব্যবধানটা রয়েই গেছে চরাচর জুড়ে , জীবন জুড়ে।  তবে প্রাণের আরাম আনা ক্লান্ত শরীরকে চাঙ্গা করা চা পরিবেশনকারী অবহেলার সরাইখানাগুলো যেন বেঁচে বর্তে থাকে। বাঙালির  স্বাস্থ্যের আর প্রতিবাদের র(Raw) চা এর পাশে যেন সগর্বে বাঁচে দুধ চিনি মেশানো প-চা টাও।
সেদিনই একটা হাসপাতালের আউটডোরে বসে আছি দেখি একটা কিশোর বয়সী ছেলে চায়ের কেটলি হাতে হুঙ্কার দিচ্ছে - " উপরওয়ালানে শোনে কে লিয়ে জিন্দেগি দিয়ে হ্যায় ! দুনিয়াওয়ালোনে খাটনে কে লিয়ে মজবুর কিযে হ্যায়। " সবাই চনমন করে উঠল। এই মুন্না এদিকে এক কাপ লিকার দে !!

মন বলে চাই চাই চা ই গো