Showing posts with label Vietnam. Show all posts
Showing posts with label Vietnam. Show all posts

Friday, March 23, 2018

পথেই হবে এ পাত চেনা

সত্যজিৎ রায়ের আত্মজীবনীমূলক লেখা যখন ছোট ছিলাম অনেকেরই পড়া। সত্যজিতের ছোট কাকা সম্ভবত সুবিনয় রায় ছিলেন ভোজন রসিক ও বিলাসী। মুখে খাবারের গ্রাস নিয়ে বত্রিশবার চিবোতেন। প্রতিটি খাবারের স্বাদ ডায়রিতে নোট রাখতেন। তো সেই বই তে তাঁর চা বিষয়ক একটি মজার লেখা আছে। মানে এক একরকম চা খেয়ে সেই চা দের চরিত্র বিশ্লেষণ। আগে সেটাই দেখি তারপর মূল লেখায় আসছি।
সত্যজিৎ বলছেন
" ছোটকাকা পেটুক না হলেও খেতেন খুব তৃপ্তি করে। রোজ এবারই ওবাড়ি গিয়ে চা খাওয়ার ব্যাপারটা  ছিল একটা বিশেষ ঘটনা। ডায়রিতে এর উল্লেখ থাকত , তবে মামুলিভাবে নয়। যে চা -টা খেলেন তার একটা বিশেষণ , আর ব্রাকেটের মধ্যে সেই বিশেষণের একটা ব্যাখ্যা চাই। 
একমাসের ডায়রি থেকে বারোটা উদাহরণ দিচ্ছি। ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে --

১) নৃসিংহভোগ্য চা (ভৈরবকান্তি-জনক ,হুহুঙ্কার প্রসাদক ,জোরালো চা )
২) বৈষ্ণবভোগ্য চা (নিরীহ , সুমিষ্ট , সুকোমল ,অহিংসক চা )
৩) বিবেকানন্দভোগ্য চা ( কর্মযোগস্পৃহাবর্ধক , বাগবিভূতিপ্রদ , তত্ত্বনিষ্ঠার অনুকূল উপাদেয় চা )
৪) ভট্টাচার্যভোগ্য চা ( বিজ্ঞতাবর্ধক ,গাম্ভীর্যপ্রদ , অনুগ্র ,হৃদ্য চা )
৫) ধন্বন্তরিভোগ্য চা ( আরোগ্যবর্ধক ,আয়ুষ্য ,রসায়নগুণ-সম্পন্ন চা )
৬) পাহারাদারভোগ্য চা (সতর্কতাবর্ধক , উত্তেজক , তন্দ্রনাশক চা )
৭) মজলিসী চা (মসগুল-মসগুল ভাবোদ্রেককারী চা )
৮) কেরাণিভোগ্য চা ( হিসাবের খাতা দেখায় উৎসাহবর্ধক , বাদামী স্বাদু চা )
৯) হাবিলদারভোগ্য চা  ( হিম্মতপ্রদ , হামবড়াভাবের প্রবর্তক চা )
১০) জনসাধারণভোগ্য চা ( বৈশিষ্টহীন ,চলনসই চা )
১১) নারদভোগ্য চা ( সঙ্গীতানুরাগবর্ধক , তত্ত্বজ্ঞানপ্রসাদক , ভক্তি-রসোদ্দীপক চা
১২) হনুমানভোগ্য চা ( বিশ্বাসযোগ্যতাবর্ধক , সমস্যা-সমুদ্রলঙ্ঘনের শক্তিদায়ক , বিক্রমপ্রদ চা ) "


ছোট থেকে যতবার যখন ছোট ছিলাম পড়েছি এই জায়গায় এসে হাসি চাপতে পারি নি। কী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ !!! কাজেই চা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ওই লাইনগুলো আগে খেলে যায় মাথায়।
আজ আবার একটা পুরোনো প্রকাশিত লেখা দিচ্ছি। লেখাটা লিখে আরাম পেয়েছিলাম। হুবহু তুলে দিলাম

এক কাপ চায়ে আমি...
প্রকাশিত হয় হ্যাংলা হেঁশেল সংখ্যা ৩১ এ
বিভাগ : পথেই হবে পাত চেনা
প্রকাশকাল : মে ২০১৫




কোন পথে যে পাত পাড়া আর কোন পথে পাতকুয়ো তার জরিপ করতে করতেই জিন্দেগি পার হয়ে যায়। হু হু করে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা হয় বিমের আলোয় সরে যায় সময় ,নড়ে যায় গন্তব্য। গতি কমিয়ে আমার লো বিম অফ দিই। আসুন সময় , মেপে নিন আমায়। আমার সবটা দিয়ে থামালাম চাকাগুলো। এটাই আমার গন্তব্য ! সত্যিই কি তাই ? আসলে এখন যেটা গন্তব্য বলে ভাবছি দুদিন বাদে সেটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যাব অন্য আস্তানায়। এরই নাম জীবন , এটাই পথ। একটা পদক্ষেপ থেকে আর একটায় হেঁটে যাই , ভেসে যাই , উড়ে যাই। এ চলা অনন্ত অবিরাম। চলেছি , চলেছি চলেই চলেছি। চলতে চলতে চালাক হয়েছি কিনা জানি না চালু হয়েছি। ঠিক ওই রাস্তার পাশের অবহেলায় পড়ে থাকা চা-এর দোকানের মতো ভাঁড়ে মা ভবানী বা গরম চায়ের ছ্যাঁকা খেয়ে সূচের ছিদ্র খুঁজেছি। ছোটবেলায় বাড়িতে বাবা মা চা থেকে বহুদূরে হরলিক্স , ভিভা , বোর্নভিটা , মলটোভার কাপে কয়েদ করে রেখেছিল।  বোনকে তো এমন থ্রেট দেওয়া হয়েছিল যে ,'চা খেলে মা মরে যায় ' !! শৈশবের সেই শঙ্কা সারা জীবন আমার ছোট বোনকে নটি ( No Tea )-র দলে , মানে না-চা-র দলে রেখে দিল। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর কলেজ ক্যান্টিনের গোপালদার হাতে প্রথম স্বাদ পেলাম অমৃত পেয়ালার ! তারপর কত চলেছি আর ক্লান্তির প্রহরগুলোতে চার্জ আপ করেছে চা। এ এক অদ্ভুত পানীয়। শহর বা মফঃস্বলের তামাম আনন্দঘন মুহূর্ত থেকে স্বজনবিয়োগের অশ্রুসজল ব্যাথার প্রহর -- সবটা জুড়ে রয়েছে চা। কত শবের সঙ্গে শ্মশানযাত্রী হয়েছি। তার মধ্যে বেশিরভাগই পরিচিত বা আত্মীয়দের।  কিন্তু বিশ্বাস করুন ওই করুণ আবহতেও যখন দেখি বড় পিসেমশাই আর সেজ জ্যাঠার মধ্যে কে শ্মশানবন্ধুদের চা খাওয়াবে তাই নিয়ে হুড়োহুড়িটা রীতিমতো প্রতিযোগিতার পর্যায়ে চলে গেছে তখন অবাক হয়ে মৃত্যুর নির্মোক ছেড়ে জীবনমুখিতায় ফিরি। মৃতের ফুলমালা , খাট ,খৈ-এর দোকান গভীর রাতে খোলাতে হলেও বাজি ধরে বলতে পারি বারুইপুর থেকে বজবজ , বাটানগর থেকে ব্যারাকপুর বা আসানসোল থেকে আদ্দিস আবাবা শ্মশানের সামনের চায়ের দোকান খোলা থাকবেই। শুধু কলকাতা জুড়ে চা নিয়ে যে উন্মাদনা তা নিয়ে গোটা একটা বই লেখা হয়ে যেতে পারে। পার্ক স্ট্রিটে T3 ( The Tea Table) এখন নেই কিন্তু অক্সফোর্ড বুক স্টোরের ওপর চা-বার (CHA BAR) আর দক্ষিণাপনে প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ত্ব ডলি বসুর Doly's Tea চা বিলাসী কলকাতার পপুলার ডেস্টিনেশন।
ময়দানে অবসরের সান্ধ্য চা 

জলপাইগুড়ি থেকে জয়নগর কত হরিদা ,মানু ভাই , রায় জি ,পাঁড়ের হাতে যে চা খেয়েছি তার শেষ নেই। আর দোকানে যদি পুরুষের বদলে প্রৌঢ় মহিলা থাকেন তাহলে অনায়েসেই মাসির আপ্যায়নে প্রজাপতি ,লেড়ো বা মেরি বিস্কুটের সঙ্গে কাচের গ্লাসে বা মাটির ভাঁড়ে কত ঝোড়ো প্রহর ফুস করে উড়ে চলে যায়। বেকার বয়েসে আমাদের আড্ডা ছিল হরিদার দোকানে। অপরিসর, ম্লান আলোমাখা মফঃস্বল রেল শহরে চারটে বেঞ্চ অপেক্ষা করে থাকত আমাদের আড্ডার সাক্ষী হতে। শুক্রবার , শুক্রবার হাট বসত। আর হাট শেষ করে যখন হাটুরেরা বাড়ি ফিরত তখন ভাঁটিখানায় ভিড় বাড়ত। তারপর মাতালদের চিৎকারে কান পাতা দায় হত। একবার এক কপাল পর্যন্ত নেশা করা মাতাল কী কুক্ষণে যেন হাজির হল হরিদার দোকানে। আর যায় কোথায় !! সবাই মিলে সেই লোকটাকে সাত - আটটা ছানার জিলিপি আর চা বলে এক কাপ জিলিপির রস খাইয়ে ছাড়ল। ছাড়ল কোথায় ! চা ভেবে সেই রস খেয়ে সেই চাতালরূপী মাতাল মাঝরাত অবধি পড়ে রইল হরিদার দোকানের সামনে। পরে ভেবেছি এরকম প্রতারণা না করলেই বোধহয় ভাল হত। 
ক্যানিং স্ট্রিটের এক প্রাচীন টি বয়লার 
  ঘুম চোখে উঠে চা -এর চাহত এ আঁকুপাঁকু করত হো চি মিন সিটিতে। দুধ চা বিরল ভিয়েতনামে। চা বলতে যা পাওয়া যেত তা হলদেটে ঠান্ডা ট্যালটালে এক পানীয়। দিন ১৫র ভিয়েতনাম সফর শুধু ওই প-চা জিনিসটার জন্যই বিরস কেটেছিল। আমার চা নিয়ে আদিখ্যেতার জন্য আর এক চায়ের সঙ্গে পরিচয় হল লেহ শহরের বাইরে সে TSE তে ( এই সে তে 'দিল সে ' সিনেমার টাইটেল সং এর শুটিং হয়েছিল ) লবজুং নোমাঙ্গ এর বাড়িতে। শুধু চা এর জন্যই সে এক ঢালাও আয়োজন। গরম জল, নুন ,মাখন আর চা পাতার মিশ্রণ সুদৃশ্য বাঁশের খোলে পিস্টনের ওপর নিচ করে তৈরি হয় গুটিগুটি চায়ে বা গুড়গুড়ি চায়ে। পোর্সেলিনের নক্সা করা পেয়ালায় সুন্দর তিব্বতি টুলে রাখা টিকোজি ঢাকা পিরিচ থেকে সেই চা ঢালতে ঢালতে বাদশাহী মেজাজ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারির নলেন গুড়ের দার্জিলিং চা 
 এরকমই চলার পথে একটা  ঘটনা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা। তখন আমি মেদিনীপুরে। একটি বেসরকারি ন্যাশনাল চ্যানেলের চিত্রগ্রাহক। ছোট আঙারিয়া কাণ্ডের সপ্তাহখানেকের মধ্যে নির্বাচনী আধিকারিকরা গ্রামে ঢুকছেন , সাথে আমরাও। লোকজন ক্যামেরা দেখে দৌড়ে পালাচ্ছে ঘরের ভিতর। পড়ে থাকছে ভাত ডাল মাখা থালা। এরকম অবস্থায় ছবি করে কাজ মিটিয়ে দেখি গ্রামের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট ঝুপড়ি। তার বারান্দায় একটা মাটির উনোন। বুঝতে বাকি রইল না ওটাই গ্রামের রাজনৈতিক মত বিনিময় কেন্দ্র -- চায়ের দোকান। হাঁকডাক করতে ভয় ভয় চোখে একজন বেরিয়ে এল। অনেক অনুরোধ , উপরোধ , অনুনয়, বিনয় করে ছবি না তোলার প্রতিশ্রুতি দিতে সে গুড়ের চা খাওয়ানোর আশ্বাস দিয়ে বলল - ' একটু আসি পাঁচ মিনিটেই ফিরব। ' পনেরো কুড়ি মিনিট পরে পাশের ঝোপ থেকে শুকনো কাঠকুটো এনে মাটির উনুন এ আঁচ দিয়ে , জলে গুড় মিশিয়ে  চা জাতীয় কিছু একটা সেই মিশ্রনে ফুটিয়ে গ্লাসে ছেঁকে দিয়ে বলল - "বাবু কবে সব ঠিক হবে ?" উত্তরটা দিতে পারিনি। অনেক কিছুই করা হয় নি। জানা হয়নি। রাখা হয় নি অনেক প্রতিশ্রুতিই। কাপ আর ঠোঁটের ব্যবধানটা রয়েই গেছে চরাচর জুড়ে , জীবন জুড়ে।  তবে প্রাণের আরাম আনা ক্লান্ত শরীরকে চাঙ্গা করা চা পরিবেশনকারী অবহেলার সরাইখানাগুলো যেন বেঁচে বর্তে থাকে। বাঙালির  স্বাস্থ্যের আর প্রতিবাদের র(Raw) চা এর পাশে যেন সগর্বে বাঁচে দুধ চিনি মেশানো প-চা টাও।
সেদিনই একটা হাসপাতালের আউটডোরে বসে আছি দেখি একটা কিশোর বয়সী ছেলে চায়ের কেটলি হাতে হুঙ্কার দিচ্ছে - " উপরওয়ালানে শোনে কে লিয়ে জিন্দেগি দিয়ে হ্যায় ! দুনিয়াওয়ালোনে খাটনে কে লিয়ে মজবুর কিযে হ্যায়। " সবাই চনমন করে উঠল। এই মুন্না এদিকে এক কাপ লিকার দে !!

মন বলে চাই চাই চা ই গো 

Monday, February 19, 2018

নাথিং অ-ফিসিয়াল...




আমার এক পিসি ছিলেন। খুব ছোট বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এক বিপত্নীকের সাথে। বিয়ের অল্প দিনের মধ্যে সামান্য ব্যবধানে হতে থাকে বাচ্ছাকাচ্ছা। তিন সন্তানের জননী বালিকা পিসি তাঁর পরিণত বয়সে আসার আগেই স্বামী হারা হন। অল্প বয়সে বিধবা নিজের জীবনের সব জৌলুস বিসর্জন দিয়ে সাদা থানের পরিধিতে সন্তানদের মানুষ করতে থাকেন। আমার স্মৃতিতে পিসির প্রথম মোলাকাত যখন  তখন তিনি প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই। আমি বড় হতে লাগলাম পিসি বৃদ্ধা হতে লাগলেন। আমরা ভাইবোনরা কোন এক অদৃশ্য পারিবারিক বর্ণ বিপর্যয়ের উত্তারিধাকারে পিসিকে 'আপি' সম্বোধনে ডাকতাম। আপির যত বয়স বাড়তে লাগলো তাঁর হাঁটা চলা কথাবলা সব কিছুর মধ্যে অনাবিল এক হাস্যরস সঞ্চার হত আমাদের মনে। স্বল্প শিক্ষিতা, আবেগ সর্বস্ব, জীবনের ঘোরপ্যাঁচ না জানা, পূর্ণিমা অমাবস্যার ঘোরতর পালনে, এঁটো সকড়ি ক্লিষ্ট মমতাময়ী আপি যেন ছিলেন সবার পারিবারিক ক্রেস, উপোসের বাইবেল আর আমাদের কাছে ভুল শব্দের ডিকশনারী। যেমন ধরো বেসিন, আপি বলবেন ডেসিন। আবার তর্ক করবেন "তোরা হাসছিস ? তবে কী ওটা মেশিন না কী বেসিন"
এরকমই  চলত। অনেক শব্দ ভুলভাল রূপে হাজির হতো আমাদের শৈশবে। হিসি করতে যাওয়া আপির ডিকশনারী তে হয়ে যেত "ফাঁকে" যাওয়া। আমাদের চাপা হাসির রোল থামতো না।
যেমন মাছের আঁশ থাকে কিন্তু আপির ডিকশনারীতে মাংস ,ডিম , পেঁয়াজ ,রসুন সব্বার আঁশ ছিল।
আসলে বাঙালি বোধহয় এমনই। পাকস্থলীকে মাছ দিয়ে ভরিয়ে রাখে। শাক দিয়ে ঢেকে রাখে স্মৃতিজাল তবু সে স্মৃতির লতাপাতা ঠেলে প্রাণপণ বেরিয়ে আসে রুপোলি মেছো মন।

এই যেমন এখন আমার লতাপাতা চাপা স্মৃতিতে ভিড় করে আসছে ছেলেবেলার মফঃস্বল রেল শহরের ছোট মাছ বাজার। মাটিতে গোল করে বড় জোর ১০ কী ১৫ জন মাছ বিক্রেতা। বাবা ডিউটি তে গিয়ে প্রায়ই ২দিন কী ৩ দিন পর ফিরতেন। সাইকেল নিয়ে হাফ প্যান্ট আমি হাজির হতাম পালান কাকু ,লক্ষী পিসি বা বাতাসী পিসির সামনে মনমত মাছ বেছে ওজন করে নিলেই কাজ মিটে যেত। দর দাম মেটানোর পর্ব হত বাবা বাজার যাওয়ার দিনে। সে সব দিন এখন শীর্ষেন্দু র উপন্যাস এর মতোই অলীক।

এমনই অলীক কয়েকটা দিন কেটেছিল শ্রীনগরে। একটা জনপ্রিয় ভ্রমণ শো তে তখন কাজ করি। অমরনাথ যাত্রা শ্যুট করে লাদাখ যাব। ইন্টারলাইন পারমিট শুটিং এর অনুমতি আর পর্যটন দপ্তরের কিছু টুকটাক কাজ বাকি। অতএব প্রায় সপ্তাহ খানেক থাকতে হবে শ্রীনগরে। সকালে অফিসিয়াল কাজ সেরে গোটা দিন নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্রাম। কাশ্মীর কি কলি র ডাল যতই মোহময়ী হোক না কেন আমার কাছে তখন ভাসমান হাউজ বোটের নিঃসঙ্গতা নিরস দিন বিরস করে দিচ্ছিল। হাউজ বোটের এক কেয়ারটেকার একটা ছিপ হাতে ধরিয়ে পরামর্শ দিলেন মাছ ধরার । লেগে পড়লাম। সারা দুপুর চার আর ছিপ সম্বল করে ভাগ্য অন্বেষণ। প্রথম প্রথম কিছুই এল না। ঝাঁঝি, পানা, পাতাকে মাছ ভাবলাম। তারপর ফাতনা নড়ল ছিপে টান লাগল ছোট ছোট মাছ আসতে লাগল। সামনে শালিমার বাগ নিসাদবাগ, চারচিনার।  ডাল লেকের পটভূমিতে উড়ে যাচ্ছে কত মাছরাঙা,  ভেসে যাচ্ছে রঙিন শিকার। শিকারীর চোখ নিয়ে একা আমি সে সব দৃশ্যকল্প থেকে দূরে একা ধনঞ্জয়ের মত মাছের ধ্যান।
পদ্মার ইলিশ ডিলিশিয়াস শুনেছিলাম। প্রথম চোখে এবং চেখে দেখলাম চিটাগাং ক্লাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটবোর্ড বিদেশী সাংবাদিকদের অভ্যর্থনায় একটা পার্টি থ্রো করেছিল ভারত বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কা ট্রাইনেশন কাপের সময় ২০১১ সালে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শচীন তেন্ডুলকরের টেস্ট সেঞ্চুরি দেখা, ৫ ফুটের ভিতর দাঁড়িয়ে মাস্টারব্লাস্টারের নেটে নকিং দেখা যদি লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স হয় তাহলে ওরিজিনাল পদ্মার ইলিশ খাওয়া আর একটা লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স এর সমাপতন। সে ইলিশ ভাজা আর বিরিয়ানির স্বাদ শব্দে বর্ণনার অতীত।
ইলিশ নিয়ে বিস্তর আদিখ্যেতায় যে সব মোহনবাগানী এতক্ষণে ভ্রু কোঁচকাচ্ছেন তাঁদের জন্য এবার একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। সালটা ২০০৬ সুন্দরবনের ডাকাতদের নিয়ে একটা তথ্যচিত্র র শ্যুটিং করছি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগের সহযোগিতা য় শ্যুট চলছিল খাঁড়ি আর জঙ্গলের গভীরে। সাথে সাথে বিশাল ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মাঝে মাঝে জেগে থাকা জনজীবনের হালহকিকত দেখছিলাম আমরা। সুধন্যখালির পথে যেতে এরকমই এক গ্রামে খেয়েছিলাম এ গ্রেড কাঁকড়া আর দারুণ চিংড়ি। সুন্দরবন এ আধা নোনা জলের চিংড়ির স্বাদ ভেড়ির চিংড়ির থেকে অনেকটাই আলাদা। আকারে বড় বিশেষ নয় কিন্তু স্বাদে অতুলনীয়।  গোয়ার সমুদ্র সৈকতে বিভিন্ন স্যাকে অবশ্য ওজনে বড় চিংড়ি বা 'লবস্টার' পাওয়া যায়। খাওয়ার আগে সেগুলোর ছবি তুলে হাঁটু জলে পা ডুবিয়ে নৈশাহারে চরম তৃপ্তি, পরম সুখ।

আর আমাদের  তাজপুর, মন্দারমণি, শঙ্করপুর বা দীঘা তো মেছো বাঙালির অভয়ারণ্য। যাঁরা এই অঞ্চলে  গেছেন পারলে একবার শঙ্করপুর মৎস্য বন্দর বা দীঘা মোহনার মাছ বাজার ঘুরে আসতে পারেন। তাজা সামুদ্রিক মাছের এত ভাল বাজার সকাল সকাল ফুরফুরে করে দেবে প্রাণমন।  যেমন পারেন বর্ষাকালে  শিয়ালদহ থেকে ডায়মন্ড হারবার লোকালে চেপে বসতে। ইলিশের মরসুমে স্টেশন থেকে ভ্যান রিকশা  নিয়ে যান মাছের আডৎ। দেখবেন সার সার ট্রলার থেকে কুইন্টাল কুইন্টাল ইলিশ এসে স্তুপাকারে জমা হচ্ছে। বিশাল বিশাল দাঁড়ি পাল্লায় বেলচা করে তোলা হচ্ছে সাধের ইলিশ । আমার ভেতো বাঙালি মনে কালচারাল শক লেগেছিল । বেলচা বাহিত ইলিশের করুন দৃশ্যকল্প অতি বড় মোহনবাগানী ও সইতে পারবেন না। নিলামের দরদাম হাঁকডাক, কলরব, কোলাহল কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পরও নাকে ভাসবে ইলিশের মোহময় সুগন্ধ।

মাছের গন্ধে গদগদ বাঙালি। কিন্তু সেই গন্ধই কখনও কখনও প্রাণ ঘাতিকা হয়ে যায়। না আমি শুঁটকির মৎস্যগন্ধা থেকে সুস্বাদু যোজনগন্ধা হয়ে ওঠার গল্প বলছি না। আমি ফিস সসের কথা বলছি। সময়টা ২০১১ সালের দুর্গাপুজোর সময়। ভিয়েতনাম যাচ্ছি ১০-১২ ঘন্টার বিমান যাত্রা আর তারপর ঘন্টা তিনেক গাড়িতে আসার পর রাত ২টো নাগাদ হোটেল পৌঁছলাম। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই। রুম সার্ভিস শেষ অর্ডার দিয়ে গেল, নুডুলস । টেবলে সল্ট, পেপার, চিলি, টোমাটো সসের সাথে ছোট্ট কাচের বোতলে ফিস সস। আমার সহকর্মী সাংবাদিক খিদের চোটে সব সসের সাথে ফিস সসও ঢেলে নিল নুডুলস এ। প্রথম গ্রাস মুখে তোলার পর তার মুখের মানচিত্র গেল বদলে। দ্বিতীয় গ্রাস মুখে উঠতেই তার গা গুলিয়ে বমি উঠে এল। তারপর সারা ভিয়েতনাম সফর মুর্তিমান ত্রাসের মত হয়ে রইল ফিস সস। দু দেশের কত মিল মাছে ভাতে মিল, জাতীয় ফুলের পদ্মে মিল, ফুটবল প্রেমে মিল। শুধু ফিস সসের দুশমনীর জন্যই "তোমার নাম আমার নাম ভিয়েতনাম" হল না।

পূর্বের থেকে পশ্চিমে গেলেও আমার সঙ্গে আঁশের মত এঁটে রইল মাছ। ডেনমার্কের হিরৎস্যালস বন্দরের কাছেই পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম সামুদ্রিক মাছের অ্যাকোরিয়াম। আর তার পরের স্টেশনেই অগুনতি ফিস ক্যাফে আর ফিস বুটিক। ঢুঁ মারতেই ট্রাউট, টুনা, সার্কের অসাধারণ সব ডিশ আর তার সাথে প্রণ, লোবস্টার। ফিলে করা কাঁচা মাছের হিমশীতল শোকেস রয়েছে তারপাশেই। একটু এগিয়ে গেলেই সার সার বিলাস বহুল ইয়াচ তাদের সেরা গেমের ছবি সাজিয়ে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে অ্যাঙ্গলিং টুরিস্ট দের অপেক্ষায়। পকেটের কিছু ক্রোণ খরচ করলেই নর্ন সি বা আটলান্টিকের গভীরে নিয়ে গিয়ে মাছ ধরা দেখিয়ে সেই মাছ সহযোগে ভরপেট পেটপুজো করিয়ে তীরে ফেরত।















লেখাটা লিখছি মণিপুরের ইম্ফল থেকে। ফুটবল ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচারের কাজে এসেছি। গত মাসেও এসেছিলাম। তখন ২৬শে জানুয়ারি। বনধ চলছে। কোথাও একটাও জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা যাচ্ছে না। ফাঁকা বাজারের একপাশে শুধু একটা দোকান খোলা। খবরের কাগজে শুকনো কিছু ভাজা মাছ (স্থানীয় ভাষায় 'নারি' ) সাজিয়ে বসে আছেন এক মহিলা। কোনও ক্রেতা কোত্থাও নেই। শুধু মিলিটারির অ্যান্টি এক্সপ্লোসিভ সাঁজোয়া গাড়ি আর ভারী বুটের শব্দ। মনে হল খবরের কাগজের ওপর এই মৎস্য অবতারই আজকের হেডলাইন।

If you like it comment below in the comment box and follow
Me in facebook , twitter & youtube




প্যারালাল মিডিয়া এ প্রকাশিত