Sunday, December 14, 2025

আশ মিটিয়ে মেসি দেখেছিলাম সেবার...

তকাল একটা লজ্জার সাক্ষী থেকেছে কলকাতা। কে? কী? কেন? সব সবার জানা। সে প্রসঙ্গে যাব না। সোশ্যাল মিডিয়া ফিড মেসি ম্যাসাকারে বিপর্যস্ত। বিশ্বের তাবড় সংবাদ সংস্থার হেড লাইনে কলকাতার অব্যবস্থা! আজ বরং একটা পুরনো লেখা রইল। লিখেছিলাম ২০১১ এ। একটা EXCLUSIVE খবর করেছিলাম আমরা, আমরা মানে একটা TEAM। এখনকার মতো ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর এক্সক্লুসিভ না, রিয়েল EXCLUSIVE। সেই খবরের পিছনের গল্পটা রইল আজকের এই ব্লগে। পড়ে মজা পাবেন। আপনার মতামত কমেন্ট করে জানাবেন। 



Mission মেসি ও দুই মা  

০৪/০৯/২০১১ বিকেল ৫টা ৩০মিনিট

যন্ত্রটার সাথে লাগানো সিকিউরিটি অ্যালার্মটা তার সর্বোচ্চ তীব্রতার কম্পাঙ্কে বেজে যাচ্ছিল। মেইন পোর্চের সামনে সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা হোটেল ও সরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের সন্দেহ মিশ্রিত দৃষ্টি প্যাকেট টাকে লক্ষ্য করে। 

সুবেশা এক নিরাপত্তা কর্মী এসে বললেন- "যদি কিছু না মনে করেন ANTI EXPLOSIVE চেকের জন্য একটু আসতে হবে।"

মনে সংশয় নিয়ে X-Ray বিমের ভেতরে ঠেলে দিলাম ১ ফুট বাই ১ ফুট বাই ৪ ইঞ্চির প্যাকেটটাকে। তিনজন নিরাপত্তা প্রকৌশলী কম্পিউটার স্ক্রিনে মারাত্মক এক বিস্ফোরক উদ্ধারের আশায় অপলকে চেয়ে আছেন! তাকিয়ে রয়েছি আমিও! 

মনিটরে কোবাল্ট ব্লু ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রোম ইয়েলো, ফ্লুরোসেন গ্রীন, অরেঞ্জ আর ক্রিমসন কালারের মিশেলে স্পষ্ট দেখা গেল মারাত্মক ঘাতক সব অস্ত্র সম্ভার! অস্ত্র ভান্ডারও বলা যায়! নিরাপত্তা প্রকৌশলীরা কপালে হাত ছোঁয়ালেন প্রণামের ভঙ্গিতে। 

একজন এগিয়ে এসে বললেন- একটু দেখব? 

খড় আর কাগজে আস্তরণ সামান্য ফাঁকা করতেই ঝকঝক করে উঠল অস্ত্রগুলো! বাকি দুজনে রাস্তা করে দিলেন হোটেলে ঢোকার।

পুরো লবিটা লোকে লোকারণ্য! তাতে সংবাদ মাধ্যমের অগ্রজ বন্ধু-বান্ধবরা, বেশকিছু সেলিব্রিটি, সাধারণ ক্রীড়ামোদী মানুষজন, ছাত্র-ছাত্রী, আর বাকিটা পুলিশ ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী। 

সবার থেকে একটু আলাদা হয়ে হোটেল হায়াতের বাঁদিকে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা অংশটাতে এসে বসলাম। 

০৪/০৯/২০১১ বিকেল ৫টা ৫০ হোটেল হায়াত

নিরাপত্তা বেষ্টনীতে মুড়ে ফেলা হলো গোটা লবিটা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতা ছাড়ার আগে শেষবার মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা তার আগেই সারতে হবে অপারেশন! এমনটাই বসের নির্দেশ ছিল। পুরো টিমটা বাঁদিকে লিফট দিয়ে নেমে হেঁটে আসছে শুধু মেসি ছাড়া নিরাপত্তা কর্মীরা ডান দিকের লিফট থেকে মেন গেট পর্যন্ত সিকিউরিটি কর্ডন করে রেখেছেন। ডান দিকের লিফট টাই এই কদিন সাধারণত ব্যবহার করেছেন লিও মেসি।

 ক্যামেরার জুম রিং, ফোকাস রিং-এ হাত সব বন্ধুদের। হঠাৎ কানে একটা দৌড়ে আসার আওয়াজ পেলাম। শব্দটা অনুসরণ করার আগেই একজন নীল-সাদা জার্সি লবির বাঁদিক দিয়ে ছুটে গিয়ে তামাম কলকাতার সংবাদমাধ্যমকে ফাঁকি দিয়ে ততক্ষণে টিম বাসে উঠে পড়েছেন। 



০৪/০৯/২০১১  সন্ধে ৬টা ৩০ হোটেল হায়াত

পায়চারি করছি। লবিটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা। একজন সহকর্মী, যে এতদিন এই হোটেলের একটা ঘরেই ঘাঁটি গেড়ে ছিল, সে এগিয়ে এল । — কী গো? বকী বলছে? কখন হবে? – তোদের ঘর ছেড়ে দিয়েছিস্ ? —ধুর্ সে তো দুপুর ১২টায় । —তাহলে? কী অবস্থা ?

হোটেলের সিকিউরিটিকে কেউ একটা বলে দিয়েছে যাতে আমাদের লবিতে থাকতে না দেয়। তুমি আমার থেকে আলাদা আলাদা থাক। আমাকে চিনে ফেলেছে। সিকিউরিটিরা তোমাকে দেখেনি।

শোন্ না, চাপ নিস্ না। চল স্মোকিং জোনটায় বসি। ওখানটা অন্ধকার, কাচ দিয়ে ঘেরা, বাইরে থেকে কেউ দেখতে পারবে না। 

০৪/০৯/২০১১ সন্ধে ৬টা ৪৫ হোটেল হায়াত

বস্ স্মোকিং জোনটায় এল। তার আগে আমি আর

সহকর্মী ওখানে বসে রয়েছি। —সব ঠিকঠাক ? - হ্যাঁ।

—প্যাকেটটা? কোথায় ?

আমি আর সহকর্মী চোখের ইশারায় দেখিয়ে দিলাম প্রায় তিন ফুট উঁচু দুটো টবের ফাঁকে ১ফুট ১ ফুট ৪ ইঞ্চি প্যাকেটটা।

—বড্ড খিদে পেয়েছে? হোটেলের খাবারের যা দাম! সহকর্মী বাইরে যাচ্ছিল কাছাকাছি দোকান থেকে কিছু খাবার আনতে বস্ ও আমাদের জন্য। আমি তাকে

বললাম

–তুই তো খাবার আনতে যাচ্ছিস আমার জন্য ৫-৬টা সিগারেট আনিস্।

— খালি সিগারেট আর সিগারেট!

শোন ভাই, এটাই শেষ সিগারেট। তাড়াহুড়োয় প্যাকেট কিনতে ভুলে গেছি। স্মোকিং জোনটায় ঘাঁটি গেড়ে থাকতে গেলে ঘণ্টায় দু'একটা করে মুখাগ্নি করতেই হবে। প্লিজ সুমিত, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। বস্ ততক্ষণে আরও একটা জিনিস আনানোর পরিকল্পনা করছে। অন্য এক সহকর্মী এই ক'দিন লিওকে দেখার সুবাদে একটা ইনপুট দিয়েছে, লিও ফেরাতে পারে না শিশু আর মাদারের কোনও স্মারক বা আশীর্বাদি বস্তু। 

০৪/০৯/২০১১ রাত ৭টা হোটেল হায়াত

সহকর্মী তিন প্যাকেট স্লাইস কেক, পটাটো চিপ্‌স আর এক বোতল জল নিয়ে এল। আমার হাতে সিগারেটের প্যাকেটটা গুঁজে দিয়ে বসল। তিনজন মিলে খাচ্ছি। ভাবছি। কী কী সিলি মিসটেকে অপারেশনটা ফল করতে পারে! বস বলল, কোচ সাবেল্লাকে খবর পাঠিয়েছি। ‘দেখা করব' বলে।

ফোনটা নীরব মোডে কেঁপে উঠল ৷ দেখি মেসেজ এসেছে। পাশের চেয়ারে বসে বস্ এস এম এস করেছে ‘ওদের ফোটা' । আমি উত্তর পাঠালাম, ওকে। উল্টো দিকের চেয়ারে বসা সহকর্মীকে জানালাম, যে কোনও প্রকারে ওই দু'জনকে বাইরে নিয়ে যেতে। বন্ধু দু'জন আমাকে বলল, কী ব্যাপার ? —দেখি যদি একটা অটোগ্রাফ পাওয়া যায়।

০৪/০৯/২০১১ রাত ৮টা হোটেল হায়াত  

সিগারেটের গন্ধ একদম নিতে পারে না বস্ । প্রায় ঘণ্টাখানেক সেই গন্ধে মাথা ধরেছিল বলে স্মোকিং রুম থেকে বাইরে বেরিয়েছিল। ফিরে এসে বসল। এর মধ্যে অগুনতি ফোন কল এবং এস এম এস-এ যোগাযোগ রাখা হয়েছে অপর দুই সহকর্মীর সাথে। তারা মাদার হাউস থেকে মাদারের দুটি পোর্সেলিনের মূর্তি নিয়ে তীর বেগে বাইক ছোটাচ্ছে হোটেল হায়াতের দিকে। বস্ বলল, আমি আর্জেন্টিনার লোকাল ম্যানেজার গোপাল ঘোষের সাথে কথা বলে এলাম । ডান ! - মানে?

- সাবেল্লা আমাদের ডিনার রুমে যেতে বলেছে। তুই একটু পরে ডাইনিং রুমের সামনে প্যাকেটটা নিয়ে থাকবি। আমি আলাদা যাব। ঠিক সময়ে তোকে ডেকে নেব । রাত ৮টা ১৫

আমি বললাম, সবার সামনে নয়। বল ১১ হয় ওদের মাদারের মূর্তি দুটো এসে গেছে। বাইক আরোহী রুমে বা অন্য কোথাও । সহকর্মীদের একজন সেই মূর্তিগুলো নিয়ে মেইন রাত ৭৩৫ পোর্চ পার করেছে খবর এল। স্মোকিং জোনে স্বস্তির হাওয়া। সাথে চাপা উত্তেজনা। রাত৮২৫

আর্জেন্টিনা টিম প্র্যাকটিস সেরে লবি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ডান দিকের লিফ্‌টটার দিকে। একটি সংবাদমাধ্যম কোচের Sound Byte নিচ্ছে। আমার অনুজ সহকর্মীটির চোয়াল শক্ত, চোখে -মুখে উত্তেজনা— সা-বে-ল্‌-লা, চলো একটা বাইট নিয়েনি। (বলেই সে কপালে হাত ঠুকছে,কারণ আমার কাছে বুম্ মাইক নেই) - তুই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখিস? - মানে? আমি বলছি সাবেল্লা ! ওই দ্যাখো! -হ্যাঁ। ন্যাট জিও। দেখিস ? তুই ? - তুমি কি পাগল ?

-না। চিতার শিকার ধরা দেখেছিস কখনও ? ধর, একটা বাইসন শিকার করবে বলে ঠিক করেছে কোনও চিতা, তখন ওটাকে দেখ স্থির, শান্ত, সমাহিত। সেই সময় কত ঘটনা ঘটেছে! পাশ দিয়ে দুটো খরগোশ দৌড়ে যাচ্ছে। একটা Wild bore একমনে মাটিতে মুখ লাগিয়ে খাবার খুঁজেছে। হরিণ ছানা আকাশের এক ফালি মেঘ দেখে অকারণে তিড়িং বিড়িং করছে। কিন্তু চিতাটা? একমনে বাইসনটার অপেক্ষা করছে। স্থির হ। বড় শিকার পেতে গেলে ছোটগুলোকে ছাড়তে হয়, ইগনোর করতে হয়। জাস্ট ইগনোর।




০৪/০৯/২০১১ রাত ৭টা ৫০ হোটেল হায়াত 

সংবাদমাধ্যমের বন্ধুরা এতক্ষণ ক্লোজ ম্যান মার্কিং-এ ছিল, এবার দুজন এসে বসল স্মোকিং জোনে। সেল

টবের পিছন থেকে প্যাকেটটা বার করে তাতে মাদারের মূর্তিগুলোকেও ঢুকিয়ে দিয়েছি। আয়েশ করে একটা সিগারেট জ্বালালাম। পুরোটা শেষ করে বেরিয়ে গেলাম লবিতে। ওয়াশ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হলাম। এবার ধীরে ধীরে এগোতে থাকলাম ডাইনিং রুমের দিকে। স্টুয়ার্ড, শেফরা ট্রলিতে করে ক্রকারি, খাবার-দাবার নিয়ে যাওয়া আসা করছে। ফুল, পারফিউম, খাবার, কফি, পনির – সব মিলেমিশে এমন একটা গন্ধ তৈরি করেছে, যাতে আভিজাত্য আর সম্ভ্রম মিলেমিশে গেছে। চাপা স্বরে নিরাপত্তা কর্মীরা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। এগোচ্ছি। ঠিক করেছি এই বারান্দাটার শেষে ডাইনিং রুমের যে দ্বিতীয় দরজাটা আছে, ওখানেই অপেক্ষা করব। বন্ধ দরজাটার সামনে এসে দাঁড়াতেই দু'জন সাদা পোশাকের নিরাপত্তা কর্মী এগিয়ে এলেন। এখানে কী প্রয়োজন ?

ভেতরে যাব। কোচ ডেকেছেন।

- প্যাকেটে কী ?

-বলা যাবে না।

—মানে? কে আপনি? কী করতে এসেছেন? দূর থেকে বস আমাকে লক্ষ্য রাখছিল। বিপদ বুঝে বসকে ফোনে ধরলাম। তখনও সিকিউরিটি অফিসাররা বলে চলেছেন,

- বলুন কে আপনি ?

বসকে ফোনে রেখেই বললাম, বলছি, সব বলব, একটু পরেই। বস্ বলছে, কোথাও একটা লুকিয়ে যা। আমি দ্রুত লবির দিকে এগোচ্ছি। লক্ষ্য স্মোকিং জোনের অন্ধকারটা। পিছন পিছন সিকিউরিটি অফিসাররা এ প্যাক অফ হাউন্ডের মতো আসছে। মনে হচ্ছে তীরে এসে তরী নয়, পুরো জাহাজ ডুবি হয়ে গেল! স্মোকিং জোনে ঢুকেই প্যাকেটটাকে টব দুটোর পিছনে চালান করে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ১০-১২ জন Security official ছুট্টে এল স্মোকিং জোনে।

কাঁহা ছুপায়া প্যাকেট? ক্যা হায় উস্ প্যাকেট মে? Narcotics? Explosives? Arms? কোন

হ্যায় আপ?

আমার সহকর্মী সুমিত কখন ঢুকেছে স্মোকিং জোনে দেখিনি। বেগতিক দেখে ও হাল ধরল। সুমিত- Look, there is a gift for the Argentina soccer players.

Security officer -

Gift? No way?

Go out of the hotel. Are you from the media? Who are you?

সুমিত ভাল করেই জানে ডাইনিং রুমটিতে মিডিয়ার প্রবেশাধিকার নেই। তাই ও বলল,

Actually look. Coach SABELLA has invited us to the Dinner.

- Let's see what's there in the Packet. মাদারের মূর্তি পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু তারপর ! মনের হাতটা ভাগ্যের কপালে ছোঁয়ালাম। স্মোকিং জোনটায় কোনও ছাদ নেই। খোলা আকাশ। অন্ধকারে শিশির পড়ছে। সেপ্টেম্বর মাস! প্যাকেটটা খুলে দেখালাম।

Metal! No way! No way! You please get out! or you will be in trouble. We will be in PROBLEM.




০৪/০৯/২০১১ রাত ৮টা ৪০

আর্জেন্টিনা টিম নৈশভোজে ঢুকছে। কলকাতা ছাড়ার আগে শেষ সাপার। স্মোকিং জোন থেকে বেরিয়ে বকে প্যাকেটটা দিয়ে বলেছি তুমিই যেও। আমি

পারলাম না।

ক্লাসের পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে মাধ্যমিকে সব বিষয়ে অজানা কোনও কারণে যদি কোন ছাত্র ডাহা ফেল করে তার মতন তখন আমার মনের অবস্থা। 'পারলাম না। 

০৪/০৯/২০১১  রাত ৯টা

কোচ সাবেল্লা ডাইনিং রুমে ঢুকে বেরিয়ে এলেন। লোকাল ম্যানেজার গোপাল ঘোষকে ডেকে বললেন, কারা লিওর সাথে দেখা করবে বলেছিলে তুমি ? বস্ আর আমি এগিয়ে গেলাম ডাইনিং রুমের দিকে।

০৪/০৯/২০১১ রাত ৯টা৩০

মাত্র দু'দিন আগে এই ঘরের সব ক'টা মানুষকে যুবভারতীর টানেলে, পলিটার্ফে দেখেছি আমি। কাঁধের ক্যামেরাটা দিয়ে আমার দেখাটা ছড়িয়ে গেছে গোটা রাজ্যে, আমার দেশে, আরও দেড়শোটা দেশে। আজ আমি একা ! সঙ্গে ক্যামেরাটাও নেই। আছে বটে— একটা পুঁচকে হোম ভিডিও ক্যামেরা। ঢুকে ‘থ’। শুধু ‘থ’ ই বা বলি কেন। ডাইনিং রুমটা চোখের সামনে দেখে মন তখন বিচিত্র বর্ণে তাতা থৈ থৈ করে নাচানাচি শুরু করেছে। 

বস্ বলেছে- তাড়াতাড়ি রেডি কর জিনিসগুলো। 

পলিপ্যাকের ভিতর থেকে মাদারের মূর্তি দুটো বার করেছি সবে। হঠাৎ গোপাল ঘোষ (ম্যানেজার আর্জেন্টিনা)-এর চাপা আর্তনাদ, নন্দন, মেসি এসে গেছে। ফাস্ট! ডান হাতে পুঁচকে ক্যামেরাটাতে লাইট লাগিয়ে Recording Switchটা টিপে দিয়েছি। বাঁ হাতে ১ ফুট ×১ফুট × ৪ ইঞ্চি-র প্যাকেটটা খুলে খড় আর কাগজের প্যাকিং ছাড়াচ্ছি। আর দেখছি নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের বড়দা THE BOY NEXT DOOR-এর মতো দাঁড়িয়ে, মেসি। লিওনেল মেসি। তাঁর পাশে কোচ সাবেল্লা ।

কাঁপছে (ইস্ কুড়ি কেজির ক্যামেরাটা কাঁধে থাকলে হয়ত কাঁপতাম না), গোটা শরীর কাঁপছে, মন কাঁপছে, মাথা কাঁপছে, হাত কাঁপছে, সময় কাঁপছে। কাঁপছে Bossও (যদিও তার T-shirt-এ লেখা- I AM NOT BOSSY I JUST HAVE BETTER IDEAS) আবেগতাড়িত – অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়! মেসির হাতে মঞ্জুষার ডোকরা কাজের পিতলের একচালা মূর্তিটা তুলে দেওয়ার সময় ওকে বলা হল- 

দুর্গা শক্তির দেবী। আগামী বিশ্বকাপে তোমাদের সাফল্যের রাস্তায় যাতে সব বাধা দূর হয়, তারই প্রত্যাশায় সর্ববিঘ্ন বিনাশিনী মহামায়া তোমাকে দেওয়া হল। আর যে সন্ত কলকাতায় তাঁর সেবাধর্মে দেবত্ব পেয়েছেন মানুষের মনে, সেই মা টেরেসা তোমাদের আশীর্বাদ করুন। দুই মায়ের আশিস নিয়ে তোমরা জয়যাত্রায় যাও । youtube, facebook, twitter-এর কল্যাণে এ গল্প সবার জানা। তাহলে গল্পটা বলার সময় ভ্যান্তাড়া করে রহস্যের প্যাকেজটা দেওয়া হল কেন? যে কোনও সচেতন পাঠকেরই এটা মনে হবে। মনে হতে পারে। সেটাই বলি ।

আসলে আমার মনে হয়, যে আদতে একজন সন্ত্রাসবাদী বা বোমা বিস্ফোরণকারী দল আর একটা রিপোর্টিং টিম যারা একটা Breaking News করার জন্য ছক সাজাচ্ছে তাদের দু'জনের কর্মপন্থা, তৎপরতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের মধ্যে খুব একটা তফাত নেই ।

ওখানেও যেমন হাজার হাজার চোখের সামনে, সবার দৃষ্টি এড়িয়ে জিলোটিন কাঠি, আর ডি এক্স দানা বা মারণ গ্রেনেড বয়ে নিয়ে যায় ‘আত্মঘাতী বাহিনী' এখানেও তেমনি নিরাপত্তা, মিডিয়া সবার সামনে দিয়ে শরৎকালে দুর্গা মূর্তিটাকে মঞ্জুষা থেকে মেসি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি, আমরা, টিম XTRATIME. 

০৪/০৯/২০১১ রাত ৯টা২০ হোটেল হায়াত 

এরপর যা হবার তা-ই হল। হায়াত হোটেলের কফি শপে ক্রিসপি, পিৎজা আর উমদা দার্জিলিং চা সহযোগে CELEBRATION. 

০৫/০৯/২০১১ রাত ১২টা১০, ইএম বাইপাস

বাই পাস ধরে হু হু ছ ট TATA SUMO.অফিসের দিকে। জানলার হাওয়াতে শরতের গন্ধ। ভাবছি। বেশ কয়েকটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে! বাইপাসের ধারে কোনও শিউলি গাছ আছে? পিচের ওপর শিশির জমে? জমে কি? বুয়েনস এয়ারসে Autumn এলে শিউলি ফোটে? হয়ত এবার থেকে মেঘ পালানো শরৎ এলে প্রতিবার যখন বাংলার গ্রামে, গঞ্জে মফসলে ফিসফিস্ করে শিশির পড়বে, শিউলি ঝরবে,তখন সুদূর আর্জেন্টিনায় কলকাতাকে মনে করাবে দুই মা–মা টেরেসা, মা দুর্গা। মনে রেখো লিও মেসি।

ফোনের রিংটোনে সম্বিত ফিরল। Episode Producer পবিত্রর তাড়া— কী করছ? তাড়াতাড়ি এসো Morning Episode -এ Breaking চালাতে হবে, তার আগে Teaser

বানাতে হবে। অনেক কাজ,

তাড়াতাড়ি এসো।

(পুরনো প্রকাশিত লেখা)

Thursday, July 31, 2025

তারকেশ্বরে শিবের পুজোর নামে চরম ব্যাভিচার!!! পূজারীর জেল, ফাঁসি!!!

 

শ্রাবণ মাস দেবাদিদেব মহাদেবের মাস। ভক্তরা দলে দলে জলের বাঁক কাঁধে ছোটেন তারকেশ্বরে। হুগলী জেলার এই শৈব তীর্থে মনস্কামনা পূরণের জন্য স্বয়ম্ভু শিব শম্ভুর মাথায় জল ঢালেন পূণ্যার্থীরা। তারকেশ্বর মন্দিরের লাগোয়া এক বিরাট পুকুর, নাম, দুধ পুকুর। দুধ পুকুরে স্নান সেরে মন্দিরে পুজো দেওয়াটাই দস্তুর এখানে। মন্দির, দোকানপাট পার করে কিছুটা গেলেই চোখে পড়বে এক বিশাল প্রাসাদ। তারকেশ্বর মন্দিরের শ্রাবণী মেলা এই প্রাসাদের সামনেই বসে। জানেন কি এই বিশাল প্রাসাদের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তারকেশ্বরের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়টা? বর্তমান তারকেশ্বর মন্দির পরিচলন সমিতির জনকল্যাণ মূলক কাজ হুগলী জেলার এই অঞ্চলের উন্নয়নের কাণ্ডারী। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনকার সময়ে এই প্রাসাদের ভুমিকা এখনকার পাশাপাশি রাখলে কল্পনাও করতে পারবেন না কতটা ভয়ঙ্কর কতটা ক্রূর ছিল এই বিশাল প্রাসাদের অতীত। সেই ঘটনাই শুনুন এখন। 




সেটা উনবিংশ শতকের বাংলা। তখন একটা খুনের মামলা এতটাই আলোড়ন ফেলে যে মানুষজন সেই মামলার শুনানি দেখতে টিকিট কেটে আদালতে যায়! শুধু তাই নয় একজন খুনিকে বীরের সম্মান দেওয়া হয়েছিল তখন। এলোকেশী হত্যা মামলা, বাংলার একটি বিরলতম খুনের মামলা। স্বামী নবীন চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বটি দিয়ে স্ত্রী এলোকেশীকে হত্যা করে ব্রিটিশ চৌকিদারের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। 

কালিঘাট পটচিত্র- মোহন্ত মাদক মেশানো পানীয় দিচ্ছে এলোকেশীকে

ঠিক কী হয়েছিল জানব। তবে মূল ঘটনায় যাওয়ার আগে একটু দেখে নেব সেই সময়কার তারকেশ্বর মন্দিরের অবস্থাটা কেমন ছিল? তারকেশ্বর মন্দিরের পরিচলনের ভার ন্যস্ত থাকে গদির ওপরে। গদির কর্তারাই মন্দিরের পরিচালনা, পুজা ও নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। তখন গিরি  মোহন্তদের হাতে ছিল মন্দিরের গদির নিয়ন্ত্রণ। এক একজন মোহন্ত ছিলেন প্রবল প্রতাপ ও ধন সম্পদের অধিকারী। তাদের লেঠেল বাহিনী, দারোয়ান এমনকি হাতি পর্যন্ত ছিল। সেই সময়ে একমাত্র সন্ন্যাসীরা হিমালয় পার করে তিব্বত পর্যন্ত যেতে পারতেন। আর এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য করতেন গিরি মোহন্তরা। তারা ভুটান হয়ে ওল্ড সিল্ক রুট দিয়ে তিব্বত যেতেন ব্যবসা, বাণিজ্য করতে। স্বভাবতই শাসক ব্রিটিশদের সঙ্গে এই মোহন্তদের খাতির ও দহরম মহরম ছিল। তাই এরা হয়ে উঠেছিলেন এক একজন জমিদার। মন্দিরের সম্পত্তির পাশাপাশি অনেকেরই ছিল বিপুল ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এরফলে মন্দিরের বেশ কিছু মোহন্তের বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ উঠতে থাকে। ১৮২৪এর ১৩ই মার্চ মোহন্ত শ্রীমন্ত গিরি এক বেশ্যার উপপতিকে খুনের দায়ে ফাঁসির সাজা প্রাপ্ত হন। তবে এসবকিছুকে বোধহয় অতিক্রম করে ছিল এলোকেশী হত্যা মামলা। ১৮৭৩ সালের এলোকেশী হত্যা মামলাকে আজও তারকেশ্বরের ইতিহাসের একটা কালো অধ্যায় হিসাবেই ধরা হয়। 

কালিঘাট পটচিত্র- মোহন্তের কাছে প্রতিদিন আসতে বাধ্য ছিল এলোকেশী

তারকেশ্বরের কাছেই কুমরুল নামের এক ছোট্ট গ্রামের ব্রাহ্মণ নীলকমল মুখোপাধ্যায়ের ছিল তিন কন্যা। বড় মেয়ে প্রসন্নময়ী,মেজ মেয়ে এলোকেশী, আর ছোট মেয়ে মুক্তকেশী। মেজ মেয়ে এলোকেশী ছিল রূপে অসামান্যা সুন্দরী। এলোকেশীর বিয়ে হয় কলকাতার বাবু  নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।এদিকে নীলকমল মুখোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি বিবাহ করেন মন্দাকিনী নামের এক মহিলাকে। মন্দাকিনীর সঙ্গে তারকেশ্বরের গিরি মোহন্তদের যোগাযোগ ছিল। 

কালিঘাট পটচিত্র-মোহন্ত ও এলোকেশী

নবীনচন্দ্রের সঙ্গে এলোকেশীর বিয়ের পর নবীনের পরিবারে  কেউ না থাকায় এলোকেশী থাকত তার বাপের বাড়ি কুমরুলে। আর নবীন চাকরিসুত্রে বসবাস করত কলকাতায়। এদিকে বিয়ের পরেও এলোকেশীর সন্তান না হওয়ায় সৎ মা মন্দাকিনী এলোকেশীকে নিয়ে যান তাঁর পূর্ব পরিচিত মোহন্ত মাধব গিরির কাছে। মোহন্ত সন্ন্যাসী হলেও শিবের আরাধনার আড়ালে ছিলেন মারাত্মক ব্যাভিচারি। মোহন্ত মাধব গিরি এলোকেশীকে কোনও নেশার ওষুধ খাইয়ে অচৈতন্য করে তার সতীত্ব নষ্ট করে। শুধু তাই নয় এলোকেশীর বাবা নীলকমলকে প্রচুর টাকাপয়সা পাঠায় মোহন্ত। একই সঙ্গে মোহন্ত জানত মন্দাকিনীর আছে সোনার গয়নার প্রতি অদম্য লোভ। সে মন্দাকিনীকে দেয় প্রচুর স্বর্ণালংকার। এভাবে প্রতিদিন একপ্রকার বাধ্য করে এলোকেশীকে তারকেশ্বরের মোহন্তের প্রাসাদে আসতে। রোজ বিকেলে কুমরুল থেকে প্রাসাদে এসে পরদিন সকালে বাড়ি ফিরত ১৩-১৪ বছরের এলোকেশী। একা নয়। তাকে নিয়ে আসত নীলকমলের বাড়ির লোকজন। কখনও প্রসন্নময়ী, কখনও মন্দাকিনী আবার কখনও বা কাজের ঝি তেলি বউ থাক। মোহন্ত মাধব গিরি আর এলোকেশীর অবৈধ প্রণয়ের এই ঘটনা নিয়ে চরম হাসাহাসি হয়, ক্রমে তা স্থানীয় মানুষজনের কাছে মুখরোচক চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে।

কালিঘাট পটচিত্র- নবীন আঁশ বটির কোপে হত্যা করে এলোকেশীকে

নবীন কলকাতায় থাকায় এসব কিছুই জানত না। কুমরুলে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সে এই ঘটনা জানতে পারে। একপ্রস্থ বাগবিতণ্ডা হয় নবীন-এলোকেশীর মধ্যে। এলোকেশী বলে এই অবৈধ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সে, কিন্তু তা করতে চাইলে মাধব গিরি তাকে মেরে ফেলবে। নবীন হ্নতদন্ত হয়ে ছুটে যায় মোহন্তের প্রসাদে। মোহন্তকে একপ্রকার শাসিয়ে আসে সে। সে চায় এলোকেশীকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার করবে।  সেইমতো পালকি ভাড়া করে নবীন। কিন্তু মোহন্ত তার লেঠেল বাহিনী দিয়ে গোটা তারকেশ্বর ঘিরে ফেলেন। পালকি নীলকমলের বাড়ি পর্যন্ত আসতেই পারে না। এলোকেশীর কলকাতা যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। এমন অবস্থায় নবীন একটি আঁশবটি দিয়ে স্ত্রীর গলায় কোপ দিয়ে তাকে হত্যা করে। আর নিজে পুলিশের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করলেও নবীন জানায় এই পরিস্থিতির জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ি মোহন্ত মাধব গিরি। নবীনের হয়ে মামলা লড়েন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কোর্টে এই মামলা চলাকালীন মামলার শুনানি সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়। লোকমুখে তা এত জনপ্রিয়তা পায় যে টিকিট কেটে মানুষজন শুনানি দেখতে আসে।

কালিঘাট পটচিত্র- কোর্টে শুনানি, টিকিট কেটে দেখত সবাই

পরবর্তীকালে এই ঘটনায় মোহন্ত ও নবীন দুজনেই দোষী সাব্যস্ত হলেও কিছু বছর সাজা খেটে তারা জেল থেকে মুক্ত হয়। নবীনকে বীরের সম্মান দিয়ে বাড়ি ফেরায় মানুষ। কিন্তু এই ঘটনা তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ ও অত্যাচারি গিরি মোহন্তদের হাত থেকে তারকেশ্বর মন্দিরকে মুক্ত করার ঘটনাক্রমে অনুঘটকের কাজ করে। এলোকেশীর ঘটনার পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তারকেশ্বরে আসেন। বহু পালা, যাত্রা, প্রহসন তৈরি হতে থাকে। কালিঘাট পটের বিষয় হয়ে ওঠে এলোকেশী মামলা। স্টার থিয়েটারে চলতে থাকে 'মোহন্তের একি কাণ্ড' পালা। মাইকেল মধুসুদন দত্তের নাটকের চেয়েও বেশি বিক্রি হত সেই সময়ে মোহন্ত মাধব গিরির ব্যাভিচারের নাটক। এলোকেশী হত্যা মামলা স্টার থিয়েটারকে খ্যাতির চূড়ায় তুলে আনে। তবে যতই কালো হোক না কেন এলোকেশীর ঘটনা। এই ঘটনায় যে জন জাগরণ হয়েছিল তাতে একজোট হয়েছিল বহু শুভ শক্তির যা তারকেশ্বরের অন্ধকার ও ব্যাভিচারের ইতিহাসকে শেষ করে।    


এই ব্লগটির তথ্যসুত্র প্রজ্ঞা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত শ্রী মানব মণ্ডলের বই - প্রসঙ্গ তারকেশ্বর। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন Wonder World Bangla য় প্রকাশিত এই বিস্তারিত ভিডিওটি। 

ব্লগের লেখাটি আপনাদের কেমন লাগল, জানান আমাকে। নিচের কমেন্ট বক্সে আপনি কমেন্ট করতে পারেন। আপনার সুচিন্তিত মতামত, ভালো বা খারাপ যাই হোক না কেন, আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আর কী ধরনের ব্লগ পড়তে চান? জানান সেটাও। আজ এই পর্যন্ত।  

Thursday, March 20, 2025

মৃত্যুকে আবার আগাম দেখা যায় নাকি!



লাইফ আফটার ডেথ আমাদের খুব প্রিয় চর্চার বিষয়। কিন্তু মৃত্যু? আজ সকালেই ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম - 

অন্য কারও মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিজে অনুভব করেছেন? গতকাল দুপুরবেলা, সব যেন নিজের চোখে দেখলাম! আর ঠিক তার পাঁচ মিনিটের মাথায়... 

এই পোস্টটা করতেই বহু মানুষ তাঁদের কনসার্ণ দেখিয়ে জানতে চেয়েছেন আমার কিছু হয়েছে কিনা। আসলে তেমন কিছু নয়। একটা বিরল, আগে অনুভব করিনি এমন অনুভূতি হল কাল। মৃত্যুর অনুভূতি! সেটাই বলছি! আমি ফেসবুক পোস্টটা করেছিলাম এটা জানতে এমনটা আর কারও সঙ্গে হয়েছে কিনা। আমার বন্ধু তালিকায় এমন কেউ আছেন কিনা। মোদ্দা কথা বিষয়টা স্বাভাবিক কিনা। দেখলাম প্রায় ১৫৯৭জন পোস্টটা দেখেছেন। তাঁদের মধ্যে ১জন মাত্র এরকম ঘটনা বা অনুভুতির সম্মুখীন হয়েছেন। শ্রী সম্রাট মৌলিক, বিখ্যাত রিভার সাইক্লিস্ট ও লেখক। সম্রাট লিখছেন তিনি বহুবার এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। 

গতকাল দুপুরে একটা কাজে মোটরসাইকেলে চন্দননগর যাচ্ছি। বেলা সাড়ে ৩টে হবে। ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ। বম্বে রোড যেখানে দিল্লি রোডের সঙ্গে মিট করে ওই জায়গাটা ক্রস করছি। পাস দিয়ে একটা বড় লরি তীব্র গতিতে ওভারটেক করল। গরমের দুপুরে তার চলে যাওয়া দ্রুতগামী চাকা শব্দ করছে চটচটচটচটচট। আমার বাইকটা একই স্পিড আর একই গিয়ারে থাকায় ঘুঘুর মত কুরররররররর করে একটা আওয়াজ তুলে চলেছে। হঠাৎ মাথায় এল কিছু প্রশ্ন। 

এখন যদি ওই চলে যাওয়া ট্রাকটা আমার ওপর দিয়ে চলে যে? তারপর, কোন শেষ অডিও নিয়ে এই সুন্দর পৃথিবী ছাড়তাম? ট্রাকের চলে যাওয়া চটচটচটচটচট! তারপর আবার একটা প্রশ্ন পায়ের ওপর দিয়ে নাকি পেটের ওপর দিয়ে চাকা চলে যেত? বিশ্বাস করুন এই ৩টে প্রশ্ন মাথায় আসতেই এক ধাক্কায় বাইকের স্পীড ২০ কিলোমিটার নামিয়ে আরও সতর্ক হয়ে থ্রটল করতে লাগলাম। ততক্ষণে দিল্লি রোডের কানেক্টর পার করেছি। আর কিছুটা গেলেই ফ্লাই ওভারের নীচ দিয়ে ইউ টার্ন করে কোন্নগরের দিকের রাস্তাটা ধরব। এমন সময় দেখলাম রোড ব্লক। পুলিশ কর্ডন করে রাস্তা বন্ধ করেছে। জ্যামটা পাস কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। পুলিশ হাঁহাঁ করে এগিয়ে এল। 

কী হয়েছে? 

একজন সিভিক ভলান্টিয়ার বললেন - "ওই দেখুন!" বাঁদিকে তাকালাম। একটা ট্রেইলার ট্রাক, তার চাকার তলা দিয়ে দুটো পা দেখা যাচ্ছে। 

উনি আবার বললেন- "বিচ্ছিরি অবস্থা পা আর পেটের ওপর দিয়ে চাকা চলে গেছে।" 

উল্টো দিক থেকে তখন তীর বেগে পুলিশের একটা অ্যাম্বুলেন্স আসছে। ওটা ঘটনাস্থলে পৌঁছোতেই রোড ব্লক উঠে গেল। আমিও এগোলাম। 

মাথাটা ঝাঁ করে উঠল। এইরে এই দৃশ্যই তো জাস্ট পাঁচ মিনিট আগে যেন দেখলাম। এটা কী হল? এটা কী করে হল? এরকম আবার হয় নাকি! এটা কী দেজা ভু deja vu? 

আমি কৃতজ্ঞ সেই সব বন্ধুদের কাছে যারা আজ আমার সামান্য একটা পোস্টে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।  

   

Friday, March 14, 2025

হাসি কান্নার দোল

দোলের সকাল। কেমন আর পাঁচটা দিনের সকালের মতো। কাল ন্যাড়া পোড়া হয়েছে, মেয়ের বন্ধুদের খুব মজা হয়েছে। ওরা ন্যাড়া পোড়ার আগুনে পোড়ানো আলু খেয়েছে কাল। 



মানুষ আজকাল বড্ড কন্ট্রোলড লাইফ লিড করতে অভ্যস্ত। কেবল বড়রাই না ছোটরাও! জল রঙে অ্যালার্জি। আবিরে কেমিক্যাল শুনেই ওরাও বড় হচ্ছে। আমাদের ছেলেবেলা অন্যরকম ছিল। হাতের রং থাকত প্রায় ১ সপ্তাহ। দোলের এক সপ্তাহ আগে থেকে ঢোল, নাল, খঞ্জনি নিয়ে গান হতো। মনন দা বলে এক বিহারী দাদা ছিলেন গানের দলের পাণ্ডা। শিব মন্দির সংলগ্ন চাতালে গান হতো, প্রতি সন্ধ্যেয়। আমি তবলা বাজাতে পারতাম বলে গানের দলে ডাক পড়ত, নাল বাজাতে। একদিন খোলও বাজিয়েছিলাম। কি আনন্দ! কি মজা! 

এই সেদিন প্রবীণ অভিনেতা সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে এসব স্মৃতির ভাঁড়ার খুলে গেল। আসলে দোলের দিনে যখন রঙের ফোয়ারা ছোটে, আবির, গুলাল ওড়ে তখন স্মৃতিরা ভিড় করে আসে। আমদের ছোট্ট রেল কলোনিতে একজন আসতেন। খাসির মাংস বিক্রেতা। এক হাতে একটা ব্যাগ আর একটা সাদা কাগজ কলম, অন্য হাতে দড়ি বাঁধা একটা ছাগল। বাড়ি বাড়ি ঘুরে কে কত মাংস নেবেন তার লিস্ট করতেন। লিস্টের মাংসের ওজন খাসির ওজনের কাছাকাছি এলেই একটা গাছের তলায় খাসি কাটা হতো। সে কি মজার বিষয়! সুমন্ত্রবাবুও বলছিলেন তাঁর যৌবনের স্মৃতি। বিহারী ফাগুয়ার গান হতো তাঁর বাড়ির চত্বরে। এখন সে সব দিন ম্রিয়মাণ হতে হতে হারিয়ে গেছে। সব সেলিব্রেশন ডিজিটাল মাধ্যমে সারা! তবে স্টার জলসার কথা সিরিয়ালের দোলের শুটিংয়ে সেই পুরনো পাড়া কালচারের ফিল পেলাম। 


অথচ আমাদের এই কলকাতা শহরেই এখনও কিছু অঞ্চলে কিছু মানুষ আগলে রেখেছেন কিছু পরম্পরা। যেমন আপনি যদি উত্তর কলকাতার দিকে কলেজ স্ট্রিট, বৌবাজার অঞ্চলে যান এই দোলের সময়ে পাবেন এক বিশেষ মিষ্টি, ঘি পোয়া। চাল গুঁড়ো, গুড় আর আরও সব উপাদান দিয়ে মণ্ড মেখে তা  ঘিয়ে ভাজা হয়। এই মিষ্টি ছাড়া দোল আর পঞ্চম দোল ভাবা যায় না ওই অঞ্চলে। 



এইরকমই এক অতীত পরম্পরার খোঁজ পেলাম রাজস্থানের জয়পুরে। 

গুলাল গোটা। লাক্ষার ফোলানো বলের ভিতরে আবির বা গুলাল দিয়ে বানানো হয়। রাজস্থান ঘোরা থাকলেও হোলির এই কালচার জানেন না অনেকেই। প্রথমে গালা বা লাক্ষার মণ্ড আগুনের তাপে গলানো হয়। তারপর ওই গলে যাওয়া মণ্ড একটি ছোট্ট পাইপের মতো ফাঁপা কাঠির আগায় লাগানো হয়। ওই পাইপকে বলা হয় ফুকনি। মুখ দিয়ে ফুকনিতে হাওয়া ভরে ফোলানো হয় গুলাল গোটা। সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা জলের গামলাতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় গোটা। যাতে তা ঠাণ্ডায় শক্ত হয়ে ওঠে। যে রঙের গোটা সেই রঙের আবির বা গুলাল ভরে কাগজ ও আঠা দিয়ে সিল করে দেওয়া হয় গোটা। প্রায় ২৯৮ বছর ধরে জয়পুরের রাজ পরিবারের আনুকুল্যে মণিহারো কা রাস্তায় হাতে গোনা কিছু মুসলিম পরিবার তৈরি করে চলেছেন এই গুলাল গোটা।       



ভারতের গোলাপি শহর, রাজস্থানের জয়পুরের নাম মহারাজা সোয়াই জয় সিংহের নামে। মাত্র ১১ বছর বয়সে পিতা মহারাজা বিষণ সিংহের মৃত্যুর পরে সিংহাসনে বসেন জয় সিংহ। ১৭২৭ সালে রাজস্থানের রাজধানী আমের থেকে জয়পুরে স্থানান্তরিত করেন তিনি। জলের প্রাচুর্য আর পরিকল্পিত শহর তৈরি এই দুই বিষয় মাথায় রেখে গড়ে ওঠে জয়পুর। ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর। এই শহরের নামের সঙ্গে অমর হয়ে আছেন এক বঙ্গ সন্তান, এক বাঙালি বাস্তুকার। তিনি নৈহাটির বিদ্যাধর ভট্টাচার্য। জয়পুর শহরের নির্মাণের দায়িত্বভার তাঁর হাতেই দেন মহারাজা সোয়াই জয় সিংহ। শিল্পশাস্ত্র ও বাস্তুশাস্ত্রের নিপুন মিশেলে বিদ্যাধর ভট্টাচার্য তৈরি করেন অতীত ভারতের অন্যতম প্ল্যানড সিটি জয়পুর।  

লেখাটা শুরু করেছিলাম এক অভিনেতার কথা দিয়ে শেষ করি আর এক অভিনেতার কথায়। গৌরব। গৌরব রায় চৌধুরী। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, এমন সময়ে হারালেন বাবাকে! তার আগের দিন গৌরব তাঁর বাবাকে বলেছিলেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন ফুল বডি চেক আপ করাতে। আর সেই চেক আপ হল না। বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। 



যেমন আমার বন্ধু অয়নের বুকের ভিতরটা আজ হুহু করছে বাবা বিনা এবারের দোলে। আসলে রং আমাদের আসল চেহারাটা ঢেকে দেয়। হাসি গুলোর সঙ্গে রঙের গড়িয়ে পড়া রঙের ধারায় কান্না বা অশ্রু বিন্দু কখন মিশে যায়, কে জানে! বুকে ফাগুনের হাহাকার, মুখে রঙের প্রলেপ থাকে। ভাগ্যিস থাকে। নইলে বেআবরু হয়ে অশ্রুধারা দেখে ফেলত কেউ। ভালো থেকো গৌরব, ভালো থাকিস অয়ন। চলতে হয়, বাঁচবার জন্য চলতে হয়, বসন্তে যেমন একটা শিমুল বা পলাশ ফুলের গাছ তার সেরা পজেশনটাকে হেলায় মাটিতে ফেলে এগিয়ে চলে নতুন দিনের, নতুন বছরের দিকে তেমন ভাবেই চলতে হয়। সব্বাই ভালো থাকবেন। রঙের উৎসবে রঙিন হয়ে। পশু পাখি আর অনিচ্ছুক মানুষজনকে বাদ দিয়ে তাদের রেয়াত করে দোলে দুলে উঠুন। 

Saturday, March 1, 2025

বয়স শঙ্কা নয় এনার কাছে বয়স সংখ্যা মাত্র

বার্ধক্যের অনেক সমস্যা। পদে পদে ভয়। তাই অনেকেই ভাবেন বয়স একটি শঙ্কা। আবার অনেকে ভাবেন বয়স স্রেফ একটি সংখ্যা। যারা বার্ধক্য কিংবা বয়সের তোয়াক্কা না করে নিজের কাজ করে চলেন তেমনই এক অশীতিপর গুণীজনের গল্প আজ । 



ভারতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, এবং তাঁদের জীবনধারণের মান বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৮.৬% ছিল ৬০ বছরের বেশি বয়সী, যেখানে মহিলাদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি। বয়স্কদের জীবনধারণের মান তাঁদের আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে। ভারতে ১৮.৭% বয়স্কদের কোনো আয়ের উৎস নেই, এবং এই অনুপাত ১৭টি রাজ্যে জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি। এছাড়া, ৪০% এরও বেশি বয়স্করা সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত।


ভারতের সংবিধান বয়স্ক নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ২০০৭ সালে প্রণীত 'দ্য মেনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেনস অ্যাক্ট' অনুযায়ী, সন্তানরা তাঁদের বয়স্ক পিতামাতার দেখাশোনা করতে বাধ্য। এছাড়া, রাজ্য সরকারগুলোকে প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট বৃদ্ধাশ্রম স্থাপন করতে হবে। সার্বিকভাবে, ভারতে বয়স্কদের জীবনধারণের মান উন্নত করতে সরকারি উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কারণে অনেক প্রবীণ নাগরিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন।


আমাদের দেশে ৮০ বছরের ওপরে বয়স্ক মানুষদের জীবনযাপন মূলত তাঁদের শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ ও আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। অনেক প্রবীণ মানুষ তাঁদের পরিবারের সন্তান সন্ততি-নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটান, নয়ত পূজা অর্চনা করেন, কেউ কেউ আধ্যাত্মিকতা, ধ্যান ও যোগে দিন কাটান। আর্থিক দিক থেকে পেনশন বা অবসরকালীন ভাতার ওপরে অনেকেই নির্ভরশীল। আবার অনেক মানুষ তাঁদের পরিবারে অন্যের ওপরে নির্ভরশীল হয়েই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়ে দেন।


তাঁদের মধ্যে কারও শখ বই পড়া, রেডিও শোনা, পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ, বাগান করা, ধ্যান-যোগ চর্চা এবং মন্দির বা ধর্মস্থলে যাওয়া। কিছু প্রবীণ ব্যক্তি সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত থাকেন, যেমন ছোটদের পড়ানো বা গরিবদের সহায়তা করা। মনোভাবের দিক থেকে অনেকে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থাকেন, তবে কিছু মানুষ একাকিত্ব, অবহেলা বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে মানসিক অবসাদেও ভুগতে থাকেন। পরিবারের সান্নিধ্য,সামাজিক স্বীকৃতি ও যত্ন তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রযুক্তির প্রসারের কারণে কিছু প্রবীণ মানুষ স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারও শিখছেন, যা তাঁদের যোগাযোগ ও বিনোদনের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে। 


জয়ন্ত সাহা, একজন ফটোগ্রাফার। তবে ফটোগ্রাফি পেশা নয় জয়ন্তবাবুর। তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয় বিভিন্ন সালোন আর প্রদর্শনীতে। বয়স বিরাশি হলেও এই বয়সে অন্যেরা যখন কাবু তখন তাঁর প্রবীণ আঙুল গুলি নিয়মিত ছুঁয়ে আসে ক্যামেরার শাটার বটন। পথে নেমে প্রতিদিন মুহূর্তদের ধরার ছায়াবাজি খেলেন এই অশীতিপর যুবক। কলকাতার রাস্তায় দিনে রাতে যে অফুরান প্রাণ তাকেই ধরার জন্যে হন্যে মাস্টার ফটোগ্রাফার জয়ন্ত সাহা।

বলেন "আমাদের সম্পর্কের পাঠ পড়ায় ইউনিভার্স।" তাঁর ফটোগ্রাফির বই OUR KOLKATA এই ভিডিওয়  জানুন তাঁর জীবনের গল্প, সঙ্গে কলকাতার অতীত থেকে বর্তমান ফটোগ্রাফি সংস্কৃতির এক চলমান ইতিহাস।  



আমি জয়ন্ত বাবুর সঙ্গে আড্ডা দিলাম কিছুদিন আগে। দেখুন সেই আড্ডার ভিডিও আমার ইউটিউব চ্যানেল Wonder World Bangla য়। লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল। 


 

Thursday, February 6, 2025

মশা মারতে কামান দাগা তো শুনেছেন, তা বলে বিড়াল বাঁচাতে কবাডি খেলা!

 

 

শা মারতে কামান দাগা তো শুনেছেন, তা বলে বিড়াল বাঁচাতে কবাডি খেলা!

 

সরস্বতী পুজো কেমন কাটল সবার? এই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই পাখা চালাতে হচ্ছে। এখনই আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে গরমটা কেমন পড়তে চলেছে এই বছর! সেদিন একটা অনুষ্ঠানে অভিনেতা জিতু কামালের সঙ্গে কথা হচ্ছিল জিতু বলছিলেন আজকাল আমাদের এখানে শীত পড়ে না। সারা বছর গরম, বর্ষা আর অল্প গরম পড়ে। প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি। সরস্বতী পুজোতেও অন্য উৎসবের মতোই শব্দ দানবের তাণ্ডব চলল। হাওড়ার উলুবেড়িয়ার ভিডিও দেখে আতঙ্ক হচ্ছিল। তারস্বরে ডিজে চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ নেচে চলেছে। এ কোন আমদানি করা সংস্কৃতি বুঝতে পারছি না। আমি যে পাড়ায় থাকি সেখানেও উদ্দাম ভয়াবহ সব গান চলল। গান পয়েন্টে ঘুমের দফারফা হল রাত আড়াইটে অবধি। বুঝি না প্রশাসন, পুলিশ কী করেন? সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। ছাত্রদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। মাইক আর লাউড স্পিকারে নিয়ন্ত্রণ আনলে কি ভোট ব্যাঙ্কে চাপ পড়ত? বা ছাপ পড়ত? তাই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে গেলেন তাঁরা যাদের পাহারা দেওয়াটাই দস্তুর! উলুবেড়িয়ার উদ্দাম নাচের ছবি যখন ভাইরাল হচ্ছে তখনই সম্রাট, সায়ন, চিত্রক, কল্যাণী দিরা তুলে ধরলেন এক অন্য ছবি। উলুবেড়িয়া থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে ঘটল এমন এক ঘটনা যা ওই উদ্দাম, অর্থহীন, মগজহীনতার মুখে সজোরে একটা থাপ্পড় মারল।

 


পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র পর্ষদ, হাওড়া জেলা বন বিভাগ, জেলা পরিষদ, বিধায়ক আর হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ আমতার গাজীপুর পঞ্চানন সংঘে আয়োজন করল এক কবাডি প্রতিযোগিতা। না প্রো কবাড্ডি লিগের ম্যাচ না। ছিল না ততটা জৌলুসও। কিন্তু এই কবাডির গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণী মেছো বিড়ালের সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারে মেয়েদের এই কবাডি টুর্নামেন্ট।

 


পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র পর্ষদের সিনিয়র অফিসার সৌমেন্দ্রনাথ ঘোষ , হাওড়া জেলা মুখ্য বন আধিকারিক দীপক কুমার মন্ডল,উলুবেড়িয়া রেঞ্জ অফিসার রাজেশ মুখার্জী , হাওড়া জেলা পরিষদের বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ মানস কুমার বসু, আমতা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মিত্র ,আমতা কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়ক সুকান্ত পাল, হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ এর সভাপতি সৌরেন্দ্র শেখর বিশ্বাস ,সম্পাদিকা কল্যানী পালুই , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেছোবিড়াল গবেষক সম্রাট চক্রবর্তী, সংসদ প্রতিনিধি তাপস বাকুলী, গাজীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান চন্দনা চোঙ্গদার ও আমতা থানার আধিকারিক সমাপ্তি রায় হাজির থেকে কবাডি খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিলেন।

এখন আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে কী এই রাজ্য প্রাণী, মেছো বিড়াল? কেন এই বিড়াল রাজ্য প্রাণী? চলুন আজ আমরা জেনে নিই এই বিড়াল সম্বন্ধে। আমরা জানি বিড়াল সাধারণত জলকে ভয় পায়। কিন্তু জলই এই বিড়ালের বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। বলা ভাল প্রধান শর্ত। এরা জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। মেছো বিড়াল জলে ডুব দিয়ে তলা থেকে বড় বড় মাছ শিকার করে। দেড় বা দু কেজির মাছ তুলে আনা এদের কাছে নস্যি। এরা বিশ্বের একমাত্র বিড়াল প্রজাতি যারা জলের মধ্যে এভাবে শিকার করে। জলাজমি এদের বিচরণ ক্ষেত্র। জলা জমিতে শিল্প, জলা ভরাট বা জলাজমি নষ্ট হওয়ায় এরাও হয়ে পড়ছে বিপন্ন। এরা মাছ ছাড়াও কীট পতঙ্গ, ব্যাঙ ও সাপ খেয়ে পরোক্ষে চাষির উপকারই করে।

 


এদের বিজ্ঞান সম্মত নাম প্রিয়োনাইলুরাস ভাইভারিনাস। বাংলায় এদের অনেক নাম বাঘরোল, মাছবাঘা, গোবাঘা, মেছো বিড়াল। এদের আকার সাধারণ বিড়ালের থেকে অনেকটাই বড় হওয়ায় এদের অনেকেই বাঘ বলে ভুল করেন। বাঘরোল নাম জনপ্রিয় হবার কারনেও অনেকে এদের বাঘের সঙ্গে গুলিয়ে আতঙ্কিত হন। বলতে দ্বিধা নেই চাকরি করার সময়ে দেখেছি মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার অনেক বড় বড় অভিজ্ঞ সাংবাদিকদেরও এদের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেই। আর তার ফলেই এদের দেখা গেলেই টিভি চ্যানেল গুলোতে হালচাল পড়ে। হেডলাইন হয়, ব্রেকিং নিউজ হয়- ‘অজানা প্রাণীর আতঙ্ক’। এদের বেঁচে থাকা আরও বিপদ সংকুল হয়ে পড়ে সৌজন্যে ‘অশিক্ষিত’ গণমাধ্যম! এই ধরনের হেডলাইনের বিরুদ্ধে আমি আগেও বহুবার সরব হয়েছি। আবারও হলাম। মাননীয় নিউজ প্রোডিউসার আপনি জানেন না যখন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপককে ফুটেজ দেখান, তিনিই আইডেন্টিফাই করে দেবেন প্রাণিটির নাম। নইলে সময় কম থাকলে গুগল লেন্সে ফেলুন। উত্তর পাবেন। আপনার অজ্ঞতা মানেই কোনও প্রাণী অজানা হতে পারে না।

 


যাই হোক মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে আসছি, আবেগপ্রবণ হয়ে। ফিরি ফিশিং ক্যাটের গল্পে। হ্যাঁ গল্পই তো। এদের সংখ্যা যেভাবে কমছে, এদের সম্বন্ধে না জানলে আগামিদিনে এদের স্থান হবে গল্পের পাতায়। তাই চিনুন এদের। এরা ধৈর্যশীল শিকারি। একটা মাছ শিকারের জন্য এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলের ধারে বসে থাকে। আর এতেই এরা মানুষের রোষে পড়ে। অথচ এরা মানুষের প্রতি মোটেই আক্রমণাত্মক নয়। সংরক্ষণের নিরিখে এরা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সমকক্ষ অর্থাৎ IUCN লাল তালিকাভুক্ত। মানে অতি সংবেদনশীল বিপন্ন প্রজাতির। আমাদের রাজ্যের রাজ্যপ্রাণী এই বিড়াল। ফেব্রুয়ারি মাস এদের জন্য সচেতনতা প্রসারের উদ্দেশ্যে বিশ্ব জুড়ে পালিত হয়। কেননা ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়াও এদের দেখা যায়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত জলাভুমিতে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশে। আর আমাদের রাজ্যে এদের আবাস হাওড়া, হুগলী, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুরের জলাজমিতে। সম্প্রতি পুরুলিয়াতেও বাঘরোল দেখা গেছে বন বিভাগের ট্র্যাপ ক্যামেরায়। মাছে ভাতে বাঙালির রাজকীয় রোল মডেল বা রাজ্যপ্রাণী এরা ছাড়া আর কেই বা হতে পারে! এদের চিনুন এদের সম্বন্ধে সঠিক বিজ্ঞানসম্মত তথ্যই এদের বাঁচাতে পারে। মানুষের সঙ্গেই এরা এদের বাসস্থান ভাগাভাগি করে নেয় বলে অভয়ারণ্য বা স্যাঙ্কচুয়ারি করে এদের সংরক্ষণ প্রায় অসম্ভব। কথাটা আমি বলছি না, একসময়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির সময়ে এই কথা আমাকে বলেন রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল, ওয়াইল্ড লাইফ, আইএফএস, শ্রী দেবল রায় মহাশয়।    

 

এদের সংখ্যা রোজ কমছে। দ্রুত কমছে। এদের মৃত্যুর কারণ রোড কিল ও মানুষের সঙ্গে সংঘাত। এই কবাডি প্রতিযোগিতার শেষে হাওড়া বন দফতরের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয় রাস্তায় দেওয়া হবে সাইনেজ। যেসব জায়গা মেছো বিড়ালের পারাপারের করিডোর সেখানে বন দফতরের পক্ষ থেকে লাগানো হবে রোড সাইন।