Saturday, March 19, 2022

আমার রঙরঙ খেলা লেখা | Holi Special Blog

 

 

 

বারের দোলে টিভিনাইন বাংলা ডট কম এ বেরোল আমার তিনটি লেখা। কতটা লিখতে পারি বা আদৌ লিখতে পারি কিনা জানিনা। তবে তিনটি আপাত উপেক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লেখার সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়ের কাছে। রইল সেই তিনটি লেখা। সঙ্গে লেখাগুলির লিঙ্ক। তিনটির ক্ষেত্রেই প্রথমে ভিডিও স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়েছে ভিডিওর জন্য, তারপর লেখ্যরূপ। তাই হয়ত লেখকরা যেমন লেখেন তার মত হয়নি অনেকটা ভিজুয়ালাইজেশনধর্মী হয়েছে লেখাগুলো।

বরাভূমের ‘বাহা সাঁদেশ’

এই লেখাটির জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা সপ্তর্ষি বৈশ্যকে। লেখা পড়ার আগে দেখে নিন ভিডিওটা। চলুন একটু ঘুরে আসি আমার বেড়ে ওঠার সুন্দরী জেলাটায়। 



প্রকাশিত লেখার লিঙ্ক

https://tv9bangla.com/entertainment/culture/huge-demand-of-organic-gulal-made-of-beetroot-neem-and-palash-flower-by-birhor-marginal-tribe-of-west-bengal-528955.html

 

বিটের মূল, নিমের পাতা, আর পলাশের ফুল। এইটুকুই সম্বল। সেই বিট, নিম আর পলাশের নির্যাস দিয়ে প্রথমবার ‘বাহা সাঁদেশ’ আবির তৈরি করেছেন পুরুলিয়ার বিরহড় জনগোষ্ঠীর মহিলারা। সাঁওতালি ভাষায় ‘বাহা’ হল ফুলের উৎসব, আর ‘সাঁদেশ’ মানে খবর। এবারের দোলে ওঁদের এই আবিরের ৫০ কিলো নিঃশেষিত হয়েছে প্যাকিং করার মাত্র ১৭ ঘণ্টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে! ওঁদের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে কাজ করেন যাঁরা, তাঁরাও হতবাক আবিরের এহেন জনপ্রিয়তায়। তাই আবার জোরকদমে শুরু হয়েছে আবির তৈরির তোড়জোড়। ২০০ গ্রাম ৭০ টাকা আর ৪০০ গ্রামের প্যাকেট ১৪০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে পুরুলিয়া, বলরামপুর বাগমুণ্ডি, বালি, বেলুড়, উত্তরপাড়া দক্ষিণেশ্বর আর উত্তর কলকাতার সমস্ত মেট্রো স্টেশন চত্বরে। আবির চেয়ে ফোন আসছে কাটোয়া, বর্ধমান আর উত্তরবঙ্গ থেকেও।

পলাশ- পুরুলিয়ার প্রাইড 


পোস্ট অফিস: নেকড়ে, গ্রাম বেড়সা। বন, পাহাড় আর পলাশে ঘেরা ভূগোলে বসবাস ভারতের অন্যতম আদিম জনজাতি, বিরহড়দের। এই মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গে ওঁদের জনসংখ্যা মাত্র ৪১০। আর সারা দেশে মাত্র ১০ হাজার। সাম্প্রতিক অতীতে চরম দারিদ্র আর অনটনই ছিল বিরহড়দের নিত্যসঙ্গী। জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে বিক্রি করাই ছিল ওঁদের মূল পেশা। আর খাদ্যাভ্যাস? ভাতের সঙ্গে কখনও আলু, কখনও শাক, জংলি পাতা কিংবা পিঁপড়ের ডিম (চলতি ভাষায় কুরকুট) ভাজা। তাঁদের সেই অবহেলার বারোমাস্যা থেকে টেনে তুলে জঙ্গলের ফলমূল আর প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে জ্যাম, জেলি আর আচার বানিয়ে পথ চলা শুরু হয় বিরহড় মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর। পুরুলিয়ার বলরামপুর ব্লক প্রশাসন আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মৈত্রেয় ফাউন্ডেশন আজ থেকে তিন বছর আগে এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কাজ শুরু করে। তারই একটি পরীক্ষামূলক ধাপ এবারের দোলে ওদের তৈরি এই আবির।

বিট বেটে অযোধ্যা পাহাড়ের ঢালে শুকনো হচ্ছে রোদে 


সবজি বাজার থেকে বিট কিনে তা কেটে, তারপর বেটে রোদে শুকিয়ে তৈরি হয়েছে বিটের আবির। জঙ্গলের নিম গাছে পাতা বেটে নিমের বাহা সাঁদেশ। আর পুরুলিয়ার গর্ব পলাশ ফুল দিয়ে তৈরি হয়েছে পলাশের আবির। তবে সেক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশিকা অক্ষরে-অক্ষরে মেনে একটাও পলাশ ফুল গাছ থেকে পাড়েননি বিরহড় মহিলারা। গাছের তলায় ঝরে পড়া রক্তিমাভ পলাশ কুড়িয়ে এনে জলে সেদ্ধ করে মিক্সার গ্রাইন্ডারে পিষে আবির তৈরি করেছেন ওঁরা। এই সব কাজের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও খুঁটিনাটি ওঁদের হাতে ধরে মহিলাদের শিখিয়েছেন ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, “পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবেগের সুড়সুড়িকে মূলধন করে নয়, বরং গুণমানে বাজারের অন্যান্য ভেষজ আবিরের সমকক্ষ হয়েই যাতে নিজের স্থান করে নেয় বাহা সাঁদেশ, সেটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল”।

মৈত্রেয় ফাউন্ডেশনের সপ্তর্ষি বৈশ্য কলকাতার মানুষ হলেও ইদানিং নিত্যযাত্রীর মতই তাঁর আনাগোনা বিরহড় ডেরা বেড়সা গ্রামে। তিনিই বলছিলেন, “বাহা সাঁদেশ বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জন হচ্ছে, তা জমা হচ্ছে ওই মহিলাদের স্বনির্ভরগোষ্ঠীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। আর লাভের একটি অংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ওই মহিলাদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ মূলধন। যাতে ওঁরা পরবর্তীকালে এই ধরনের কাজ করতে গিয়ে কারও মুখাপেক্ষী না হন। এমনকী আমাদের সাহায্য ছাড়াও ওঁরা যাতে প্রকৃত পক্ষেই স্বনির্ভর হতে পারেন। এটাই এখন আমাদের মূল উদ্দেশ্য।" 

জলে ফুল সিদ্ধ করার পর ছাঁকা হচ্ছে পলাশ ফুলের নির্যাস


বসন্ত ঋতুরাজ। সে তার সেরা সম্ভার হেলায় পথে ছড়িয়ে বীর সন্ন্যাসীর মতো হেঁটে চলে যায় নীল দিগন্তে। অযোধ্যা পাহাড়ের ঢালে সদ্য নির্মিত নীলরঙের কিছু বাড়িতে এখন প্রান্তিক, আদিম এই বিরহড়দের ডেরা। এবারের বসন্তে ঝরে পড়া অরণ্যের সম্পদ ফুল পাতা দিয়ে বসন্তের রঙ বানিয়ে ওঁরা হাজির আমার আপনার সঙ্গে রঙমিলান্তির খেলাতে। ওঁদের তৈরি এই রঙ যেন আমাদের মর্মে, কর্মে আর যাওয়ার পথে এগিয়ে যেতে লাগে! তাই কি ফুল ফুটিয়েছে পুরুলিয়ার পাহাড়তলির পলাশবন?

এবার দেখুন ভিডিও যেটা প্রকাশিত হয়েছে টিভি নাইন বাংলা ডিজিট্যালে 


 



 

পোয়াবারো- ঘি পোয়া

ফেসবুকের গ্রুপ কলকাতার নকশি কথা দারুণ। এই গ্রুপের মেম্বারদের অনেকেই কলকাতা ও তার আশেপাশের অনেক বিষয় নিয়ে পোস্ট দিয়ে থাকেন। তাই এই লেখার জন্য তাঁদের জানাই কৃতজ্ঞতা।

প্রকাশিত লেখাটির লিঙ্ক

https://tv9bangla.com/lifestyle/food/this-dessert-is-available-only-during-holi-days-in-kolkata-529431.html

  

 

দোল রঙের উৎসব, মিষ্টিরও। মঠ, বাতাসা, লাড্ডু, সন্দেশ, নাড়ু, খাজা, গজা, জিলিপি, পায়েস, পেঁড়া, ছানা, দই, ঠাণ্ডাইয়ে মাখামাখি হয়ে বসন্ত যখন জাগ্রত হয় প্রতিবার, তখন ভিড় জমে বৌবাজারের এই ছোট্ট দু’টি দোকানে। ‘শ্রীহরি’ আর ‘রাধারানী সুইটস’। যেন রাধামাধব আর বৃন্দাবন বিলাসিনী রাইয়ের যুগলবন্দি। দোল থেকে পঞ্চম দোল—প্রতিবছর মানুষের ঢল নামে দোকান দু’টোয়। হোলির সময়ে এক বিশেষ মিষ্টি পাওয়া যায় এখানে। শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে, তবুও একই রকম জনপ্রিয়তা এই দোকানের এই বিশেষ মিষ্টির। নাম ‘ঘি পোয়া’। প্রতি পিসের দাম মাত্র ৬টাকা। চেনা শহরের অচেনা এই মিষ্টির খোঁজ দিচ্ছে TV9 বাংলা। চেনা শহর কল্লোলিনী কলকাতার অচেনা এই মিষ্টি দেখতে হুবহু আলুর চপের মতো। ভাজা হয় খাঁটি গব্য ঘিয়ে।

বৌবাজার, নতুনবাজার, বেহালা আর উত্তর কলকাতার তামাম বনেদি বাড়িতে এই মিষ্টি ছাড়া দোল অচল। কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিতে দোল গোবিন্দের আরাধনায় ভোগ নিবেদন হয় ঘি পোয়া দিয়ে। দোল থেকে পঞ্চম দোল ঘি পোয়া ছাড়া প্রসাদ নাকি মুখে রোচে না বনেদি বাড়ির ননীচোরার। তাই সারা শহরে উত্তর থেকে দক্ষিণ যত প্রাচীন বাঙালি বাড়ি আছে, তাঁদের কাছে দোলের এক ঐতিহ্যের সমার্থক হয়ে উঠেছে এই ঘি পোয়া। রজত পাইন বৌবাজারে থাকেন। তিনিই বলছিলেন ঘি পোয়ার এই ট্রাডিশানাল ক্রেজের কথা। দেবমাল্য শীল প্রতিবছর এই মিষ্টির টানে ফিরে-ফিরে আসেন এই দোকানে। দোলের চাঁচড়ের পুজোয় সঞ্জীবকুমার মল্লিকের বাড়িতে পুজো হয়। তার জন্য দু’দিন আগেই তিনি এসে বায়না করে গিয়েছেন ১৫০ পিস ঘি পোয়া, জানালেন শ্রীহরি সুইটসের মালিক কৃষ্ণ গুপ্তা। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি অনবরত গাওয়া ঘিয়ে ভেজে চলেছেন এই ঘি পোয়া। হালুইকরদেরও ফুরসত নেই। জানালেন তিন প্রজন্ম ধরে চলে-আসা এই ঘি পোয়ার রেসিপি। চালের গুঁড়ো, সুজি, গুড় আর ঘি দিয়ে মেখে মণ্ড তৈরি করা হয়। তারপর হাতের তালুর চাপে চ্যাপ্টা করে গরম ঘিয়ে ভাজা হয় সেই মণ্ডের পোয়া।

কলকাতার বাঙালি বনেদি বাড়িতে দোলে গোপাল সেবায় মাস্ট এই মিষ্টি। আর লাগে মালপোয়া। শ্রীহরি সুইটসের পাশের দোকান রাধারানী সুইটসের নরেশ গুপ্তা বলছিলেন ঘি পোয়ার যোগ নাকি ওড়িশায়। শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথধামে ছাপান্ন ভোগের এক ভোগ এই ঘি পোয়া। জগন্নাথের উৎকল থেকে এই খাদ্য সংস্কৃতির আগমন এই বাংলায়। তা-ও শতাব্দীকাল আগে।

পূর্ণিমায় দোল গোবিন্দর ভোগের জন্যই এই মিষ্টির চাহিদা এখন তুঙ্গে। আপনিও যদি চান, চেখে দেখতে চলে আসুন বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রীটের বৌবাজার মার্কেটের সামনের এই দোকান দু’টোয়। গরমাগরম ঘি পোয়া প্রতি পিস মাত্র ৬ টাকা। মুখে দিয়েই বৃন্দাবনের বিলাস। তবে সাবধান, এটা খাবার পর ঠাণ্ডা পানীয় খাবেন না। গরম চা কফি চলতে পারে। খাঁটি ঘিয়ে তৈরি তো, তাই ঠাণ্ডা খেলে বিপত্তি ঘটতেই পারে!

এবার দেখুন ভিডিও যেটা প্রকাশিত হয়েছে টিভি নাইন বাংলা ডিজিট্যালে 


 

ঘুম-ON

এই ত্রয়ীর অন্তিম লেখা ওয়ার্ল্ড স্লিপ ডে বা বিশ্ব নিদ্রা দিবস নিয়ে। যাঁদের ঘুম নিয়ে সমস্যা তাঁদের  কাজে লাগতে পারে এই লেখাটা। কৃতজ্ঞতা জানাই সেলিমপুরের সোমনস স্লিপ ক্লিনিকের ডাঃ সৌরভ দাসকে আর অরেঞ্জ স্লিপ অ্যাপনিয়া ক্লিনিকের ডাঃ উত্তম আগরওয়ালকে।  

প্রকাশিত লেখার লিঙ্ক

https://tv9bangla.com/health/important-facts-about-sleep-you-need-to-know-529981.html

 

আজ বিশ্ব ঘুম দিবস। ঘুম হেলাফেলার বিষয় নয়। সারা দুনিয়া জুড়ে চিকিৎসকরা বলছেন ঘুম সম্বন্ধে সচেতন হতে। আর সেই কারণেই ওয়ার্ল্ড স্লিপ সোসাইটি বলছে ঘুমের গুণগত মান ভাল হলে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে যা তৈরি করে একটা সুন্দর পৃথিবী। আমাদের প্রতিদিনের কাজে আমরা সম্মুখীন হই বহু ঘটনার। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি রয়ে যায় স্মৃতিতে। এই স্মৃতিশক্তি তৈরিতে ঘুমের ভূমিকা অপরিহার্য। সুস্থ ভাবে বাঁচার জন্য সুন্দর ভাবে ঘুমনোটা জরুরী। কিন্তু কেমন ভাবে আসবে সুখের সেই সুস্থ ঘুম? কিন্তু কেমন ভাবে আসবে সুখের সেই সুস্থ ঘুম?

কলকাতার দুজন চিকিৎসক ডাঃ সৌরভ দাস এবং ডাঃ উত্তম আগরওয়াল আমাদের জানালেন কী কী করলে আসবে SOUND SLEEP

শোওয়ার ঘরটিকে করুন যতটা সম্ভব নিঃশব্দ ও অন্ধকার ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফোন সাইলেন্ট বা এয়ারপ্লেন মোডে রাখুন বিছানার চাদরটাকে টানটান ও পরিষ্কার করে নিন ঘুমের আগে অল্প উষ্ণ গরম জলে স্নান করলে ভাল ঘুম আসে সন্ধ্যের পর চা, কফি বা নরম পানীয় খাবেন না, ধূমপান একদমই নয়। এই নিয়ম মানতে পারলে ভাল ঘুম আসবেই । পরের দিনের করণীয় কাজের তালিকা কাগজে লিখে রাখুন আর সেই দিন কী করলেন তাও লিখুন ঘুমোতে যাওয়ার আগে। দেখবেন চিন্তা মুক্ত ঘুম আসবে । রাত্রের দিকে কম জল খাওয়া অভ্যাস করুন। দিনে বেশি জল খান। ডিনারের পর অল্প অল্প সিপ করে জল খান ঘুমোতে যাওয়ার আগে টয়লেট করে শুলে রাত্রে অযথা ঘুম ভাঙবে না বেডরুমে ঘড়ি এমন ভাবে রাখুন যাতে বিছানায় শুয়ে ঘড়ি দেখা যাবে না। তাই ঘড়ি দেখে ঘুম না আসার অস্থিরতাও থাকবে না। এতে করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে না।

চিকিৎসকরা বলছেন অনিদ্রা বা অতিনিদ্রা দুটোই শরীর খারাপ হওয়ার কারণ হতে পারে।

তাই জেনে নিন কতটা ঘুমনো উচিত একজন সুস্থ মানুষের। কমপক্ষে কতটা ঘুম দরকার কোন বয়সের মানুষের –

সদ্যজাতদের জন্য- ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা প্রাইমারি ক্লাসে পড়ুয়াদের জন্য – ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সেকেন্ডারি ক্লাসের পড়ুয়াদের জন্য – ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা প্রাপ্ত বয়স্কদের ৭-৯ ঘণ্টা

অনেকে ভোরে ট্রেন বা ফ্লাইট ধবার চিন্তায় সারারাত ঘুমোতে পারেন না। সেক্ষেত্রে কীভাবে অ্যালার্ম দিলে ভাল ঘুম হয় ?

ডাক্তারবাবুরা বলছেন এক্ষেত্রে যদি ভোর ৫ টায় উঠতে হয় তাহলে অ্যালার্ম দিন আগের দিন বিকেল ৫ টায়। আর তারপর সব কাজ রাত ৮টার মধ্যে মিটিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যান ।

যারা রাতের শিফটে কাজ করেন তাঁদের ঘুমোতে হবে সকালে। আর সেই ঘুমটাকেও দিতে সমান গুরুত্ব। ভারি পর্দা ঝুলিয়ে রেখে ঘরটাকে অন্ধকার রাখতে হবে । ঘুমোতে যাবার এক ঘণ্টা আগে থেকে চলবে না সেলফোন বা অন্য কোনও ডিভাইজ ব্যবহার করা।

বাঙালি নাকি ঘুমকাতুরে! তার নাকের ডাকে নাকি কাক চিল বসে না বাড়িতে। সারা বাংলা জুড়ে একটা সমীক্ষা চালিয়ে ডাঃ সৌরভ দাস জানাচ্ছেন সামগ্রিকভাবে বাঙালির ঘুমের মান কেমন? আর সেই সমীক্ষার ফল হতাশ হবার জন্য যথেষ্ট। ডাঃ দাস বলছেন সামগ্রিক ভাবে বাঙালির ঘুমের মান খুবই খারাপ। আর ষাটোর্ধদের ক্ষেত্রে সেটা আরও খারাপ হয়ে সংকটজনক অবস্থায় এখন।

এই মুহুতের পৃথিবীতে ৮০ টিরও বেশি স্লিপ ডিজঅর্ডারের খোঁজ দিয়েছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। যার মধ্যে সংগীত শিল্পী বাপ্পি লাহিড়ী র অকাল প্রয়াণের কারণে সচেতনতা এসেছে স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে । বাপ্পির মৃত্যুর পর থেকে ভিড় বাড়ছে শহরের স্লিপ ক্লিনিক গুলোয়। কোথাও হয়ত দেরিতে হলেও হয়ত আসছে সচেতনতা । আর এই সচেতনতাটা সারা বছর জারি রাখতেই আজকের এই বিশ্ব নিদ্রা দিবস । তাই কোনও কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলেই ডাক্তারবাবুর কাছে যান। গুরুত্ব দিন ঘুমকে । শুধু আজ নয় আজীবন।

Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য, কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা সংক্রান্ত নয়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।


এবার দেখুন ভিডিও যেটা প্রকাশিত হয়েছে টিভি নাইন বাংলা ডিজিট্যালে



 

Thursday, March 10, 2022

এরকম খবর করলে মন শান্তি পায়




ন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের সকালে কোয়েল একটা ফেসবুক পোস্ট দেখাল। এক বৃদ্ধা নবান্নের  কাছেই কংক্রিটের ওপরে পথের ধুলোয় পড়ে রয়েছেন। ছবিটা দেখে মনে হল এটা নিউজ মেটিরিয়াল। এক অশক্ত বৃদ্ধা। চোখ গুলো কেমন করুন। অফিসে যাবার জন্য বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে রক্তিমকে জানালাম বিষয়টা।

- এটা করে তবে অফিস এসো। কী বিষয় পুরোটা দেখো। এটাই স্টোরি। 

দেখা শুরু হল আমার। 

তার পরবর্তী গল্প সবার জানা। সে গল্পের অবতারনা এখানে নয়। 

 সে গল্প দেখুন এখানে

আমাদের কাছে সেই খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন সমাজকর্মী রত্নাবলী রায়। পথ ভোলা পথিক নাকি সন্তান পরিত্যক্তা? প্রশ্ন উঠেছিল হাওড়ার শিবপুর, মন্দিরতলা এবং নবান্ন অঞ্চল জুড়ে মানুষের মধ্যে। মঙ্গলবার রাত্রেই মন্দিরতলার একজন বললেন- পুলিশ নিয়ে গেছেন ওই বৃদ্ধাকে। 

বুধবার সকাল সকাল ফোন করলাম হাওড়া সিটি পুলিশের শিবপুর থানার ওসি অরূপ বাবুকে। তিনি জানালেন সুরক্ষিত আছেন ওই বৃদ্ধা। এখন ভর্তি রয়েছেন হাওড়া জেলা সদর হাসপাতালে।

বুধবার বেলা ১১টা-  হাওড়া জেলা সদর হাসপাতালে নবান্নের ফুটপাথে পড়ে থাকা মাকে। একটা বিছানা জুটেছে তাঁর। আর পথ নয়। ঘুমোচ্ছেন অনেকটা স্বস্তিতে। বৃদ্ধা এখনও নিজের পরিচয় ঠিকঠাক জানাতে পারছেন না চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের। ফিমেল মেডিক্যাল ওয়ার্ডের খাতায় উনি ‘আন নেমড’। আপাতত পরিচয় একটাই - বেড নম্বর এক্স ৬৫। 

চরম ব্যস্ততা ডাক্তার বাবুদের। একজন পেসেন্ট ঢুকেছেন। পয়জনড কেস। তাঁর স্টম্যাক ওয়াশ পর্ব চলছে। তার মধ্যেই একজন চিকিৎসক জানালেন কেউ একজন এসেছিলেন যিনি ওনাকে নিজের মা বলে দাবি করেছেন। ওয়ার্ড থেকে বলা হয়েছে ওই ব্যাক্তিকে নিজের পরিচয় পত্র এবং প্রমাণাদি এনে যোগাযোগ করতে। হাসপাতাল সুপার ডাঃ নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় এর সঙ্গে কথা বললাম। অনুরোধ করলাম যদি কেউ আসেন একবার যেন আমায় জানানো হয়। আর একবার গেলাম বেড নম্বর এক্স ৬৫ র কাছে। তখন তিনি  ডাল, সয়াবিনের তরকারী আর মাছের ঝোল দিয়ে পরম তৃপ্তিতে ভাত মেখে খাচ্ছেন।  

শিবপুর থানায় গেলাম। তারপর ওই নীল সাদা থাম। নবান্নের কাছে। যে স্তম্ভগুলির নীচে হতভম্বের মত বসে ছিলেন ওই বৃদ্ধা। 

বিকেল গড়াতে না গড়াতেই ফোন ঢুকল ডাঃ নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় এর। বেড নম্বর এক্স ৬৫ র বাড়ির লোক এসেছেন। জানালাম আমি আসছি ওঁদের একটু অপেক্ষা করতে বলুন। 

তারপর এল বৃদ্ধার ছেলের ফোন। ওনারা আমি গেলে আমার সঙ্গে কথা বলে তবেই মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। 

সন্ধ্যা নেমেছে হাওড়া সদর হাসপাতাল চত্বরে। জানা গেল পরিচয়। দুই ছেলে এসেছেন মা কে নিয়ে যেতে। ৭ মার্চ থেকে মা নিখোঁজ। বড় ছেলে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করেন। ৭ তারিখ সকালে একটু দেরিতে ফিরেছেন। ছোট ছেলের রঙিন মাছের ছোট্ট ব্যবসা। কাজের জন্য তাঁকেও বেরোতে হয়েছে। বড় ভাই বাড়ি ফেরার আগেই বেরিয়ে যান ছোট ভাই। দুই ভাই আর মায়ের সংসার। তাই ওই সময়ে মা একলাই ছিলেন। মানসিক অবস্থা বয়সের কারণে একটু বিঘ্নিত। কানে কম শোনেন।

বাড়ি খালি দেখে মা বেরিয়ে পড়েন বাড়ি থেকে। নিরুদ্দিষ্টের গন্তব্যে। তারপর হন্যে হয়ে দুই ভাই মা কে খুঁজেছেন। ব্যাটরা থানায় মিসিং ডায়েরিও করেছেন। খুঁজে পান নি মাকে। 

তারপর আমদের ওই প্রতিবেদন। তা দেখে বৃদ্ধার ছোট ছেলেকে জানান তাঁর এক বন্ধু - মা রয়েছেন নবান্নের ফুটপাথে। 

ছেলে আসেন নবান্নের সামনের পুলিশ আউটপোস্টে। সেখান থেকে শিবপুর থানা হয়ে সদর হাসপাতালে।

খুঁজে পান মাকে। পুরো প্রক্রিয়াটায় আমরা রয়ে গেলাম একটা ছোট্ট যোগসূত্র হয়ে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন ছেলেরা। জানতে চাইলাম বৃদ্ধার পরিচয়। ওঁদের বাবা প্রয়াত সুভাষ চন্দ্র বোস। আর মা?

বেড নম্বর এক্স ৬৫ নয়। অনিলা। অনিলা বোস। 

ওঁরা তিন জন ধীরে ধীরে হেঁটে বেরিয়ে আসছেন। ছোট ছেলে সুশান্তকে জিজ্ঞাসা করলাম

- কিসে নিয়ে যাবেন মাকে? টোটো ডেকে দেব? 

-না দাদা বাসেই যাব। টোটো আশি টাকা চাইছে। অত টাকা কোথায়! বাসে যাব, একটু তো পথ। পৌঁছে যাব। 

তিনজন, অ্যাম্বার রঙের পথে মৃদু হেঁটে যাচ্ছেন, নীল রঙের আলোয় লেখা হাওড়া জেলা হাসপাতালের গ্লোসাইনটা জ্বলজ্বল করছে। বাড়ি ফিরছেন যিনি, উনি অনিলা। 

দেখুন বাড়ি ফেরার ভিডিও

Monday, October 18, 2021

আমি এবং আমার স্ত্রী এবারের পুজোয় নতুন জামা কিনলাম না - কেন?




পুজো কেমন কাটল আপনাদের? তৃতীয় তরঙ্গের আশঙ্কার মধ্যে এবারের দুর্গোৎসব। পুজোর কটা দিনের পর করোনার সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে। তারমধ্যেই আমরা বাঙালির সেরা উৎসবের উদযাপনটা করে নিলাম। এবারের দুর্গাপুজোয় আমি আর আমার স্ত্রী কোয়েল কোনও নতুন জামা কিনলাম না। বিষয়টা এরকম নয় যে কেনার জন্য অর্থের সঙ্গতিতে কোনওরকম অসুবিধা ছিল। দুজনের দুটি নতুন বস্ত্র কেনবার সামর্থ পরম করুণাময় ঈশ্বরের আশীর্বাদে ছিল। কিন্তু একটা লেখা এমনভাবে নাড়া দিয়ে গেল যে নতুন বস্ত্র কেনার ইচ্ছেই করল না। সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। এবারে আমরা দারুণ পুজো কাটিয়েছি। 

বাড়ির ছোট আর বড়দের জন্য সামান্য কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে বেরোলাম। ইচ্ছে ছিল কোনও শপিং মল নয় ছোট দোকান থেকে কিনব যতটুকু প্রয়োজন। গড়িয়াহাটের দোকানে দোকানে ঘুরছি। বহুদিন বাদে ছোট শপিং কমপ্লেক্স গুলো খুলেছে। মানুষগুলো, যারা দোকান দিয়েছেন লড়াই করছেন। অসম লড়াই একটা। অনলাইন শপিং পোর্টালের সঙ্গে লড়াই, বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে লড়াই, ঝাঁ চকচকে শপিং মলের সঙ্গে লড়াই। মূল রাস্তা থেকে অনেকটা ভিতরে, কম সুবিধা প্রাপ্ত, নন এসি, অনেকটা আমাদের এই মফস্বলে বড় হওয়া দম্পতির ছোটবেলায় দেখা দোকানের মত লড়াকু মানুষগুলোর কাছেই গেলাম 'পূজা শপিং' এ। সম্বোধনেই আন্তরিকতার ফারাকটা স্পষ্ট। কর্পোরেট 'স্যার-ম্যাডামের' পরিবর্তে "দাদা আসুন বৌদি বসুন কী দেখাব?"। 

লাভলি মিষ্টি শ্রাবণী রাহুল 

এরই মাঝে আমার মেয়ের বয়সী এক মেয়ে আর তার বন্ধু আমাদের দিকে এগিয়ে এল। দুজনের মধ্যে বড় যে ষে এগিয়ে এসে হাতের পঞ্চবটী ধুপের গোছা দেখিয়ে বলল "নাও না গো একটা"। আমরা বরাবর ওই ধুপটার জন্য মুখিয়ে থাকি গড়িয়াহাট গেলেই। অন্য শিশুটি ছুট্টে চলে গেল অন্য খদ্দেরের আশায়। ধুপ কিনে আমার স্ত্রী বাচ্চাটির সঙ্গে কথা বলা আরম্ভ করলেন। জানা গেল, ওর নাম লাভলি আর বছর পাঁচেকের পুঁচকেটার নাম মিষ্টি। দূরে মিষ্টি দোকানের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে। ডাকলাম এই মিষ্টি শোন। অপরিচিত কেউ ওর নাম ধরে ডাকছে এটায় ওরা বোধহয় অভ্যস্ত নয়। দুজনের থেকেই ধুপ কিনলাম। আমাদের প্রিয়জনদের  জামাকাপড়ের সঙ্গে ওই ধুপগুলোও উপহার দেব ঠিক করেছিলাম। কেনাকাটার পর বাড়ি ফিরব এমন সময়ে দেখা হল আবার লাভলি আর মিষ্টির সঙ্গে। ওরা ওদের দিদি শ্রাবণীকে নিয়ে ঘুরছে।

লাভলি বলল- "আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা"।

 "দিদি দ্যাখ এই কাকু আর কাকিমাটা আমাদের থেকে কত গুলো ধুপ কিনেছে জানিস"!

কোয়েল শ্রাবণীর থেকেও ক'টা ধুপ নিল

শ্রাবণী- "আমাদের জন্য তোমাদের কতগুলো টাকা ফালতু নষ্ট হয়ে গেল, তাই না"!

বাইরে ঝড় উঠেছে। বাড়ি ফেরার তাড়া। তার মধ্যেই ওদের সঙ্গে অল্প গল্প করলাম আমরা। লাভলি, মিষ্টি, শ্রাবণী আর রাহুলের মত বাচ্চাগুলো গড়িয়াহাটার ফ্লাইওভারের তলায় বাবা মায়ের সঙ্গে থাকে। আমি টিভি নাইন বাংলার একটা ভিডিও শ্যুটে গিয়ে ওদের মত অনেক বাচ্চাকে দেখেছি লক ডাউনের সময়ে। সে কথা ওদের বলতেই ওরা বলল "একদিন তোমরাও খাওয়াবে আমাদের"? 

বিজ্ঞাপনের ভাষায় শিশু আর শ্রমিকের মধ্যে দূরত্ব রাখা যায় না এ শহরের ফুটপাথগুলোয়। পার্ক সার্কাস আর পার্ক স্ট্রীটের বেলুন বিক্রেতা সাবানা, করিশ্মা আর গড়িয়াহাটের লাভলি মিষ্টি শ্রাবণী আর রাহুলরা মিলে মিশে যায়। আমাদের শহরের শ্রমিক শিশুরা দূরত্ব চায় না। মর্যাদা চায়। শ্রমিকের মর্যাদা। শিক্ষা চায়। একটু মানুষের মত বাঁচতে চায়। এই শহরে, এই দেশে শিশুশ্রম আছে। ঘোরতর ভাবেই আছে। কর্পোরেট চাইলেও আছে না চাইলেও আছে। সংস্কৃতি মনস্ক বাঙালি চাইলেও আছে না চাইলেও আছে। শিশু আর শ্রমের মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে চাইলে শ্রমিক শিশুদের পরিবারের খাদ্যের জোগানকে সুনিশ্চিত করতে হবে আগে। এই শহরে বড়বড় পুজোয় কোটি কোটি টাকা ফুঁকে যায়! স্রেফ ফুঁ দিয়ে উড়ে যায়। আর ধুপের ফেরিওয়ালা শিশুরা সুগন্ধ বিক্রি করে!   


গারমেন্ট লাইফ আর রিসাইকেল - পৃথিবীর জন্য জরুরী 

পুজোর ঠিক আগে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে একটা লেখা পেলাম সোশ্যাল মেসেজিং এ । লেখাটি লিখছেন রুপান্তরণ ফাউন্ডেশনের স্মিতা সেন। এই লেখাটি পড়ে আমরা, মানে আমি আর আমার স্ত্রী মনস্থ করলাম এবার পুজোয় চাই না আমাদের দুজনের নতুন জামা।  


স্মিতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ নেই। ওনাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওনার পোস্ট করা সোশ্যাল মিডিয়ার সেই বার্তা হুবহু তুলে দিলাম নীচে। অত্যন্ত মুল্যবান এবং দামী কিছু সময়োপযোগী কথা স্মিতা লিখছেন-    

সামনেই উৎসবের মরসুম। উৎসব মানেই নতুন জামাকাপড় কেনা। ছোটবেলায় পুজোর সময়ের অতি পরিচিত আলোচনা ছিল কার কটা জামা হল। আজকাল অনলাইন কেনাকাটার দৌলতে সারা বছরই জামাকাপড় বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ আবার মন ভালো রাখতে শপিং করেন, যেটা বেশিরভাগ সময়ই জামাকাপড়। নতুন জামা  সারাবছরে কতগুলো কিনব এবার বোধহয় হিসাব করার সময় এসে গেছে। একটু সহজ করে বলার চেষ্টা করছি।  

পরিসংখ্যান বলছে ১৫ বছর আগে আমরা যে পরিমাণ পোশাক ব্যবহার করতাম, এখন করছি তার দ্বিগুণ। ফলে এখন ফ্যাশন থেকে সৃষ্ট বর্জ্যের পরিমাণও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। আগে মানুষ একটা পোশাক যে পরিমাণ ব্যবহার করত, এখন তার শতকরা ৪০ ভাগও করে না। এখন একটা পোশাকের গড় আয়ু দুবছর দুমাস। আর সেটি গড়ে ৭ থেকে ১০ বার পরা হয়। আমরা এমন একটা বিশ্বে বাস করছি, যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় বহুগুণ বেশি পোশাক উৎপাদন করা হয়। গার্মেন্টসের জঞ্জালে ভরে উঠেছে পৃথিবী। 

আপনি ভাবছেন, আপনার টাকায় আপনি ফ্যাশন করবেন। তাতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে। একটা সুতির টি-শার্ট বানাতে যে পরিমাণ কাপড় লাগে, সেটির জন্য প্রয়োজনীয় তুলা উৎপাদন করতে ২০ হাজার লিটার জল খরচ হয়। বিশ্বে যত জল ব্যবহৃত হয়, তার শতকরা ২০ ভাগ খরচ হয়ে যায় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে। স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং, ফিনিশিং, গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, পোস্ট কনজিউমিং-প্রতিটা ক্ষেত্রে উৎপাদিত হয় বর্জ্য। পরিবেশদূষণের যত কারণ, তার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পোশাকশিল্প।  ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যাশনশিল্পের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বর্জ্য নিঃসরণ বৃদ্ধি পাবে ৬০ শতাংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে আমার-আপনার চাহিদা মেটাতে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, তার তিন গুণ প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন হবে। ক্লাইমেট চেঞ্জ কিন্তু আর বইয়ে পড়ে ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। অতিবৃষ্টি, অতিগরম, সাইক্লোন, দাবানলের খবরে আমরা টের পাচ্ছি এবার ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়টা আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। প্রশ্ন হল আমি, আপনি, আমরা - সাধারণ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষরা কি করতে পারি?

প্রথমত, ‘গার্মেন্ট লাইফটাইম’ বাড়ানো। মানে এক পোশাক বেশি দিন পরা। পোশাকের আয়ু বাড়ানো। যদি নতুন পোশাক না কিনে একটা পোশাক মাত্র ৯ মাস বেশি পরেন, তাহলেই ওই পোশাকের মাধ্যমে কার্বন উৎপাদন আর ওই পোশাকের পেছনে ব্যবহৃত অপচয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

পুরোনো পোশাক ফেলে না দিয়ে ‘ভ্যালু অ্যাড’ করুন। শাড়ি দিয়ে পর্দা, কুর্তি থেকে কুশন কভার, শার্ট দিয়ে ব্লাউজ, ফুলপ্যান্ট কেটে হাফপ্যান্ট - পৃথিবীকে এবার আপনার ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর সময় এসেছে। রিসাইক্লিংয়ের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ আমাদের কাঁথা। ভেতরের দিকে বেশি পুরোনো কাপড়, আর ওপরের দিকে কম পুরোনো কাপড়, শাড়ির সুন্দর পাড় ব্যবহার করে কি দারুণ নকশা বানাতেন আমার ঠাকুমা। এমনকি সুতোটা পর্যন্ত পুরোনো শাড়ি থেকে বের করা হত। আমাদের হাতে টাকা আসায় এই প্রয়োজনীয় ভ্যালুগুলো হারিয়ে ফেলছি। নিজেদের পারদর্শিতা না থাকলে অন্য কারোর সাহায্য নিয়ে রিসাইক্লিং করি। 

পরিমিতিবোধের সাথে পোশাক কিনুন। দরকারে কেনাকাটা করুন, ক্যালেন্ডার দেখে নয়। "পুজোয় কটা জামা হল?" এই প্রশ্ন করা সত্যিই অনুচিত। 

(এই অংশটি স্মিতা সেনের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া)

একবার রিসাইকেল্ড পোশাক নিয়ে হিডকোর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর শ্রী দেবাশিস সেনের সঙ্গেও কথা হয়েছিল বেশ কয়েক মাস আগে। প্রশাসনিক কর্তা শ্রী সেন নিজের কাঁথা স্টিচের জ্যাকেট দেখিয়ে একটা কথা বলেছিলেন আজও পরিষ্কার মনে আছে , " দেখুন এই জামাটা আমি বাই চান্স নয় বাই চয়েস পরেছি"। এই বাই চয়েস পুরনোকে নতুন করে পরার মানসিকতাই বোধহয় বাঁচাতে পারে পৃথিবীকে। দরকার নেই বেশি কিছুর। আমি একটা সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে দেখেছি। এক শার্ট একাধিক অনুষ্ঠানে পরতে কোনও রকম অস্বস্তিতে পড়তেন না বাইশ গজের মহারাজ। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ গুলো বোধহয় নিজের কাজের মধ্যেই উদাহরণ রেখে দেন। আর একজন, প্রিন্সেস ডায়ানা। একাধিক বার গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে একই পরিধেয় 'রিপিট' করতেন লেডি ডায়ানা, যা ওই স্তরের মানুষজনদের মধ্যে বিরল। এভাবেই নিঃশব্দে কাজ করে চলেছেন কিছু মানুষ। আগামী দিনগুলোয় খাদ্যের সংকট, পানীয় জলের সংকট যাতে আমার আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে না ধরে তার জন্য চলুন না আজ থেকেই ভাবনা শুরু করি, কাজ করা শুরু করি।

   

Tuesday, September 21, 2021

তবু মনে রেখো - প্রসঙ্গ অ্যালঝাইমারস ডে


জ কথা তাঁদের নিয়ে। যারা মনে রাখতে পারেন না। "মনে রাখতে পারেন না" মানে ধরুন ব্রেকফাস্টে কী খেয়েছেন? ওষুধটা খেয়ে ফেলে যারা ভাবছেন ওষুধটা খেতে হবে। পুরনো স্মৃতি আসতে আসতে ফিকে হচ্ছে। কাকে কী বলেছেন? অমুক ব্যক্তি কে? তাঁর সঙ্গে কী ব্যবহার করা উচিত ? এরকম বহুবিধ দৈনন্দিন সহজ বিষয় গুলো যাঁদের কাছে মারাত্মক জটিল। ভুলে যাওয়ার একটা গহ্বরে যারা রোজ তিল তিল করে ডুবে যাচ্ছেন। আজ বিশ্ব অ্যালঝাইমার ডে World Alzheimer’s Day আর এই সেপ্টেম্বর মাসটা অ্যালঝাইমার সচেতনতার মাস। 

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের চারপাশ কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। বিনিদ্র রাত যাপন করি আমরা তাও বলতে পারিনা ইনসমনিয়ার কথা। শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অঙ্গটা সেই মস্তিষ্কেরও যে সমস্যা হতে পারে এবং তার জন্য ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। এই ছোট্ট বিষয়টা এই ২০২১ এও আমাদের অনেকের মাথায় ঢোকে না। আর ঢুকলেও সামাজিক অপমানের ভয়ে অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়েই জীবনযাপন করেন। রোজ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে বাঁচেন ।

অ্যালঝাইমার একটা জটিল মানসিক অবস্থা। যে ক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষটির ব্যবহারিক জীবনে চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং সামাজিক গুণাবলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে পরিস্থিতি। পরিসংখ্যান বলছে আমাদের দেশে প্রায় ২৪ লক্ষ মানুষ এই মুহূর্তে এই রোগে আক্রান্ত। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে অ্যালঝাইমার রোগাক্রান্তদের মধ্যে পাঁচটি মানসিক রোগের বা ডিজঅর্ডারের লক্ষণ দেখা যায়। অ্যামনিজ়িয়া, আফেজ়িয়া, অ্যাপ্রাক্সিয়া, অ্যাগনোসিয়া এবং অ্যানোমিক অ্যাফেজ়িয়া। তাঁরা সংক্ষেপে এই ৫টি রোগকে 5 A of  Alzheimer’s Disease বলে চিহ্নিত করেছেন। 

অ্যামনিজ়িয়া (Amnesia)- অ্যামনিজ়িয়ায় আক্রান্তরা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন ক্রমশ। ধীরে ধীরে সমস্ত স্মৃতি লোপ পায়। যত সময় যায় ধীরে ধীরে কমতে থাকে স্মৃতির ভাঁড়ার। চেনা মানুষ এমন কি সন্তান সন্ততিকেও চিনতে পারেন না এই রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ। অ্যামনিজ়িয়া ২ ধরনের রেট্রোগ্রেড অ্যামনিজ়িয়া (Retrograde Amnesia) এবং অ্যান্টিরেট্রোগ্রেড অ্যামনিজ়িয়া (Anterograde Amnesia)। অনেক আক্রান্ত মানুষ চোখের সামনে যা ঘটছে তা ও মনে রাখতে পারেন না।

আফেজ়িয়া (Aphasia)- এই অবস্থায় আক্রান্ত মানুষটির ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন, কথা বলা ভীষণ সমস্যার হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কথাবার্তা বলা। কী বলবেন, তার জন্য কী শব্দ প্রয়োজন, কীভাবে সেই শব্দ উচ্চারণ করবেন তা অনেক সময়ে বুঝতে না পেরে মানুষটি হয় ডুবে যান নৈশব্দের অতলে নয়ত এলোমেলো কথা বলতে শুরু করেন, যে কথা বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত। এক তীব্র কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন ওই ব্যাক্তি।

 অ্যাপ্রাক্সিয়া (Apraxia)- মোটর স্কিলগুলো আক্রান্ত হয় এই পরিস্থিতিতে। যার ফলে জলের গ্লাস ধরে মুখ পর্যন্ত তোলা, স্নান করা বা জামাকাপড় পরবার মত সহজ কাজ গুলো হয়ে ওঠে দুরুহ, কষ্টকর। আর তাই ধীরে ধীরে হাঁটা চলাও হয়ে যায় কম। আক্রান্ত ব্যক্তির পড়ে যাবার ঝুঁকি বাড়ে। সারাক্ষণের দেখভালের লোক অত্যন্ত প্রয়োজন এই ধরনের মানুষদের জন্য। 

অ্যাগনোসিয়া (Agnosia)- এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত হয়ত কিছুটা ঠিকঠাক কথা বলতে পারছেন কিন্ত অপর দিক থেকে তাঁকে যা বলা হচ্ছে তা বুঝতে প্রচণ্ড অসুবিধা হয়। অর্থাৎ তাঁর কমিউনিকেসন স্কিলের ক্ষেত্রে সিগনাল রিসিভ করতে অসুবিধা হয়। এর ফলে প্রায়শই দেখা যায় ওই ব্যক্তির শ্রবণশক্তি, ঘ্রানশক্তি, স্বাদ, স্পর্শের অনুভুতি এবং দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় ক্রমশ। 

অ্যানোমিক অ্যাফেজ়িয়া (Anomic Aphasia)- এই পরিস্থিতিতে অ্যাফেজ়িয়ার লক্ষণগুলো ছাড়াও মানসিক আঘাত এবং কথা বলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিস্কের বাঁ দিক আক্রান্ত হয়। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে মস্তিস্কের কোষগুলি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। 



আজ বিশ্ব অ্যালঝাইমার ডে উপলক্ষে রবীন্দ্র সেতু বা হাওড়া ব্রিজ রঙিন হবে নীল রঙে। অ্যালঝাইমার এন্ড রিলেটেড ডিজরডারস সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার কলকাতা চ্যাপ্টার আয়োজন করেছেন এই সচেতনতার। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে অ্যালঝাইমারের সচেতনতায় এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই রোগে আক্রান্ত মানুষ ও তাঁদের পরিবারের লড়াইয়ে শক্তি যোগাবে।










Friday, September 10, 2021

জয় করো এই তামসিরে - আত্মহত্যা কোনও সমাধান নয়


 অনেক দিন আগে কবীর সুমনের একটা অ্যালবাম বেরিয়েছিল - ঘুমোও বাউণ্ডুলে। সেই অ্যালবামে একটা গান ছিল- 

"থেমে যেতে যেতে 

একবার কোনও মতে

জোর করে যদি একবার 

হেঁটে যেতে

বেঁচে নিতে যদি একবার

বড় ভাল হত"।


আমরা রোজ মারা যাই , রাত্রে , সাময়িক, ঘুমের মধ্যে । রোজ আবার বেঁচে উঠি, জেগে উঠি সাময়িক মৃত্যু-ঘুম ছেড়ে। মৃত্যু চিরন্তন। মরণ তুঁহ মম শ্যম সমান। জন্ম নিয়েছে যে তার মৃত্যু আছেই। কাম ক্রোধ বা অন্য ষড় রিপু না থাকলেও জাগতিক প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃত্যু এড়ানোর কোনও উপায় নেই। একটাই জীবন। একবারই খেলতে নামা। ক্রিজ ছেড়ে চলে যাব? কেন? 

আজ সারা দুনিয়া জুড়ে এই বিষয় নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছে। আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। করোনা আবহে আত্মহত্যার প্রবণতা আরও বেড়েছে মানুষের মধ্যে। বহু আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এবং শারীরবৃত্তীয় কারণ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর অন্ধকারে। 

সমস্যা এতটাই জটিল হয়ে গেছে এই অতিমারি পরিস্থিতিতে যে শিনরিন - ইয়োকু র দেশ জাপানে এই মুহূর্তে আত্মহননের হার সবচেয়ে বেশি। জাপানিরা ভাল থাকার বিষয় তাঁদের দৈনন্দিন জীবন চর্যার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছেন যুগ যুগ ধরে। তাহলে তাঁদের কেন এমন অবস্থা। আমাদের দেশে কৃষক, ছাত্রছাত্রী, এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের আত্মহত্যার হার বেড়েছে। বাদ যান নি ডাক্তার কিংবা শিক্ষকরাও। 

টেকনলজি আমাদের বেগ দিয়ে আবেগ কেড়ে নিয়েছে। আমরা সারাদিন অনলাইন থাকি । আপডেটেড থাকি। অথচ পাশের বাড়ির, পাশের ঘরের, পাশের বালিশের মানুষটার খোঁজ রাখি না। আর রাখি না বলেই আমরা অনেক আত্মহনন আটকাতেও পারি না। এই অবস্থায় তাই কথা বলাটা খুব জরুরী। আত্মহননের ইচ্ছা একটা মানসিক অবস্থা। যার থেকে আমাদের টেনে বার করে আনতে পারেন একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই যিনি রোগী তাঁর পরিচিত, পরিবার বা বন্ধুদের উচিত ট্যাবু ভেঙে, লজ্জা সরিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে যাওয়া। 

ইন্টারনেটে সার্চ করে রোগ সারাব, বা রোগীর কাউন্সেলিং করব ভাবাটা বোকামো। এটা একটা স্পেসালাইজড বিষয় তাই স্পেশালিষ্টকেই দরকার। আর নেটে অনেক হেল্প লাইন পাবেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আজ একটা প্রতিবেদন করলাম টিভি নাইন বাংলায়(TV9 Bangla)। সেই প্রতিবেদনে কিছু তথ্য নেবার জন্য হেল্প লাইনে (নাম বলছি না ) ফোন করলাম টানা দু দিন । কেউ ফোন ধরলেন না । অতএব নিজেই নিজের আলো হয়ে জ্বলে উঠুন। গোলাপ হয়ে ফুটে উঠুন। সমস্যাকে জয় করাই জীবন। সমস্যা না থাকলে মজা কোথায়?  মৃত্যু কোনও সমস্যার সমাধান নয়। বরং সমস্যাটাকে আরও কিছু মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে পালিয়ে যাওয়া। তাই চিয়ার্স টু লাইফ।  

রইল আজ আমার করা একটা ভিডিওর লিঙ্ক। 

দেখুন সেই ভিডিও


https://youtu.be/hUvPbgzMK0Y


Sunday, September 5, 2021

কে শিক্ষক?

অনেকটা শৈশববেলা তখন। রান্না করতে করতে পড়াত মা। গরম খুন্তি উঁচিয়ে বলত অমনোযোগী হলেই “দেব?” রুটির আটা মাখা সেই খুন্তিই শিখিয়েছে- মনযোগী হও। প্রণাম প্রাজ্ঞ খুন্তি

তারপর এলেবেলে ছেলেবেলা স্কুল। লাল নীল কমলা বাটিরা থরে থরে সেজে বসত। সেই স্কুলে টিফিন বেলা শিখিয়েছে- ভাগ করে খাও।

শহরের ইংলিশ মিডিয়াম। অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মিস। হাতটা বেজায় মারকুটে। লেখা বেঁকে গেলেই ভয়। গাল লাল করে থাপ্পড় শিখিয়েছে- মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য হল মানুষ লিখতে পারে।

সরকারী স্কুলের বাইরে তেঁতুল গাছ। পাড়তে পারতাম না টকফল। শৈশবের বন্ধু শিখিয়েছে- পাথরের অব্যর্থ নিশানা। আহা কি পরম পাওয়া !

রবিবার শিখিয়েছে- সোমবার স্কুল তাই দুদ্দাড় আনন্দে হও মশগুল ।

হুহু করা সাইকেল প্যাডেল শিখিয়েছে- গতির প্রথম পাঠ।

সহপাঠী শিখিয়েছে- কলেজ কেটে সিনেমা।

যৌবন শিখিয়েছে সিগারেট, সিগারেট শিখিয়েছে- পুড়ে হও খাক

বেকারত্ব শিখিয়েছে – টিউশনি টাকা দিয়ে দেখা সুমনের গান

সুমন শিখিয়েছে- আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি, কার তাতে কী ?

প্রেমিকা শিখিয়েছে অপেক্ষা আর ছেড়ে চলে যেতে হয়

দেহ শিখিয়েছে- জন্মের জন্য ছোট আর মৃত্যুর জন্য বড় হওয়ার খেলা

দেহকাম শিখিয়েছে- চুম্বন ব্যাকরণ, ঠোঁট জ্বালা থেকে যায় থেমে গেলে কম্পন

বন্ধু শিখিয়েছে- “পাতিয়ালা কীভাবে বানাই দেখ শালা” বা “বীজ থাকলে টানলেই ফাটবে”।

প্রথম বেতন শিখিয়েছে- ২ কিলো মটন কেনা সুখ

অসুখের বিল শিখিয়েছে- ফিট থাকা কতটা জরুরী

বন্ধুর ছদ্মবেশ শিখিয়েছে- বিশ্বাস করা পাপ ( ক্ষমা করবেন রবীন্দ্রনাথ)

টিভি শিখিয়েছে- দাগ অচ্ছা হ্যয়

মালিক শিখিয়েছে- পোষালে থাক না পোষালে যা ( অথচ মুখে কিছু বলে না)

শ্রমিক শিখিয়েছে- আমারই ঘামের বৃষ্টি নামে লাল সেলাম

হাত ছাড়া ট্রেন শিখিয়েছে- ৫ মিনিটের দাম

পথ শিখিয়েছে- ঘরের টান

আর ঘর শিখিয়েছে- পথের ক্লান্তি ভুলে কোলে তুলে নিতে

স্ত্রী শিখিয়েছে – পাশে থাকা

সন্তান শিখিয়েছে- পিতৃত্ব আর আবার কার্টুন দেখা

কার্টুন শিখিয়েছে- সহজ বাঁচতে সবাই পারে না।

বটগাছ শিখিয়েছে- শুধু ছায়া দিতে হয়

ঘাস শিখিয়েছে- নত হলেও শিকড় ছড়িয়ে দেওয়া চাই

শিকড় শেখালো – রবি ঠাকুর (যাঁদের জীবনে তিনি নেই তাঁরা রোদ্দুর রায়ের চেয়েও পচা কপালে)

সূর্য শেখালো- দিন

দিন শেখালো- হয় আনি খাই নাহয় “দিন না, দিন না ,‌ আমি তো খাপের লোক”

সমানে সমানে টক্কর দেওয়া প্রতিপক্ষ শিখিয়েছে- ঠিকঠাক থাক নইলে গিলে খাব সবশুদ্ধ

রাত শিখিয়েছে- ভৌ, জাগা কুকুরের মত অতন্দ্র প্রহরা

কুকুর শিখিয়েছে- আনুগত্য আর মায়া

মায়া শিখিয়েছে- বন্ধন হীন হতে

মুক্তি বোধ শিখিয়েছে- শূন্য, (মৃত্যুর পর কমলা আগুন )

মৃত্যু বোধ শিখিয়েছে- পুড়ে গেলে রক্তমাংসঘাম পুড়ে যায় সব বদনাম/ আমার দুর্নাম যেন না পোড়ে নিস্কাম অমরত্বের ঘোরে/ আমি যেন বেঁচে থাকি না।

প্রথাগত শিক্ষকদের অত্যন্ত হতাশ করেছি আজীবন। তাই তাঁদের দূর থেকে প্রণাম। আর এরাও তো শিক্ষক তাই এদেরও স্মরণ করছি আজ। শেষে দুটো প্রিয় লাইন।

“গুরু বলে কারে প্রণাম করবি মন?
ও তোর অতীত গুরু, পথিক গুরু, গুরু অগণন”

Wednesday, September 1, 2021

প্রাণঘাতী শিরোনাম সংরক্ষণের জন্য ঘাতক


গত সোমবার লেখা আমাকে বাঘা বোলো না ব্লগটা শুরুতেই একবার চোখ বুলিয়ে নিন কারণ এই পোস্টটা ওটার সঙ্গেই সম্পর্কিত। হাওড়ার ওই অঞ্চলে বাঘরোল সাইটিং(Sighting ) হওয়ার পর থেকেই। এলাকায় একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। যে ঘটনায় মানুষের খুশি হওয়ার কথা ছিল তাতেই তাঁরা আতঙ্কিত! বহুকাল ধরে এই এলাকাগুলো বাঘরোলের প্রাকৃতিক হ্যাবিট্যাট(Habitat)। অর্থাৎ স্থানীয় ইতিহাস বলছে বন্যপ্রান আর মানুষের সহাবস্থান ওই এলাকায় যুগ যুগ ধরে রয়েছে। সংঘাত হয় নি।

তাহলে এখন কেন হচ্ছে? প্রথমত এর জন্য দায়ী অশিক্ষা। এই অশিক্ষা বলতে আমি কোনও স্কুল কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার কথা বলছি না। প্রকৃতি লব্ধ জ্ঞান। তলানিতে এসে পৌঁছেছে আমাদের। প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে যোগ কমে যাচ্ছে আমাদের। ফলত আমরা জানি না কোনটা কী। আমাদের চারপাশে কী আছে, যার সঙ্গে যাদের সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগ যুগ যুগান্ত ধরে! 

ইন্টারনেটের গণতান্ত্রিকতা আমদের সুবিধা দিয়েছে ইনফরমেশন খোঁজার। একই সঙ্গে ইন্টারনেট অশিক্ষা ছড়ানোরও একটা উত্তম মাধ্যম। আপনার হাতে ডেটা আছে, মোবাইলে বাই ডিফল্ট একটা ক্যামেরা আছে যাতে ফোটো ও ভিডিও রেকর্ড হয়। অতএব মনের মাধুরী মিশায়ে তাহারে করুন রচনা!! 

এই কথা লেখার কারণ ওই দুটি গ্রামের মানুষকে "অজানা জন্তু" সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য দেওয়ার বদলে কিছু ইউটিউব মিডিয়া এলাকায় গিয়ে যা করলেন সেটাকে আর যাই হোক সাংবাদিকতা বলা যায় না। বন্যপ্রান সম্বন্ধে কাজ করতে গেলে প্রতিবেদন বিজ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত। বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে থাকে প্রাথমিক ৩ শর্তের ওপর পরীক্ষা, নিরীক্ষা এবং সিদ্ধান্ত। বন্যপ্রানের প্রতিবেদনও তাই হওয়া উচিত। এটা আমার মত। এবং আমার এই ধারণা তৈরি হয়েছে বর্তমান পৃথিবীতে হার্ডকোর ওয়াইল্ড লাইফ কভারেজ অনুধাবন করে। এটাই হওয়া উচিত। এটা একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড রীতি। 

সংরক্ষণ কর্মীরা প্রায়ই বলে থাকেন বন্য প্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে "মশলা" খবর বা " Sensational News" প্রাণঘাতী। সংরক্ষণের জন্য মারাত্মকও বটে। এক্ষেত্রে ওই গ্রাম গুলির মানুষ আতঙ্কিত। তাঁদের কাছে যাবার আগে অল্প একটু পড়াশোনা করতেই পারতেন সংবাদ কর্মীরা। বাঘ আর বাঘরোলের তফাতটা নিজে জানতেই পারতেন। তা না করে তাঁরা যেটা করলেন তা হল কেবল উত্তেজনা ক্যামেরাবন্দী করে সেই উত্তেজনাটিকেই আরও বাড়ালেন। এরপর গ্রামবাসীরা যদি নিরীহ ফিশিং ক্যাটটিকে বাঘ বা অজানা প্রাণী ভেবে আতঙ্কে, ভয়ে পিটিয়ে মারে তার দায় কে নেবে? 

একদিকে রাজ্যপ্রাণীটিকে নিয়ে নেই সরকারি মন্ত্রক স্তরে সচেতনতা প্রসারের উদ্যোগ, কম সুবিধাপ্রাপ্ত বন দপ্তরের কর্মী (অনেকটা ঢাল তরোয়াল বিহীন কেবল মনের জোর সর্বস্ব নিধিরাম সরদার ) আর কিছু বন্যপ্রান সংগঠন (যাঁদের ফান্ড নেই আছে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর উদ্যোগ), এই নিয়ে সংরক্ষণ (পড়ুন মোকাবিলা) চলছে আমাদের রাজ্য প্রাণীটিকে বাঁচানোর। IUCN তালিকায় যে লাল। মানে অবলুপ্তির প্রহর গুনছে। উল্টোদিকে সীমাহীন অশিক্ষা। 

Monday, August 30, 2021

বাজা তোরা রাজা যায়




ত্তেজনায় হাত পা কাঁপছিল সূর্যদার কথা শুনে। সূর্যদা আজকালের দপ্তরের কাজ সেরে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের অফিসে আসতেন বিকেল বিকেল। ২০০২ এর সেই বিকেলে এসে স্বভাবসিদ্ধ বড় বড় শ্বাস আর হাঁপানি সহযোগে সূর্যদা বললেন "চল আজ লালাদার বাড়ি যাব"। লালাদা মানে বুদ্ধদেব গুহ'র সানি টাওয়ার্সের বসতবাড়িতে ঢুকে চোখ টেরিয়ে গিয়েছিল। ছাদ থেকে মেঝে অবধি কাচের দেওয়াল। সারা ঘর জুড়ে সাজানো সুদৃশ্য শো-পিস আর বই। শোবার ঘরের খাটে, বিছানার মাঝ বরাবর বইয়ের তাক। বিছানার মাথার দিকেও তাই। লেখার বিশাল একটা টেবিল, যার সামনে রাখা চেয়ারটা গদিতে মোড়ানো। সেই চেয়ারে উঠে বসতে গেলে সিঁড়ির মত দুটো ধাপ বেয়ে উঠতে হয়। তখন মোবাইল ফোন এলেও তাতে ক্যামেরা আসে নি। সেলফি তো দূর অস্ত। 

একটা উজ্জ্বল কমলা রঙা পাঞ্জাবি পরে বসে ছিলেন লালা মিঞা। বড় একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন সূর্যদা। সঞ্জীব খান আর আমি ক্যামেরা ট্রাইপডে ফেলে গোগ্রাসে গল্প শুনেছিলাম বুগু'র মুখ থেকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে যখন রাত বাড়ল সুগন্ধী দিয়ে ধোয়া ঘরটা থেকে বেরিয়েছিলাম আমরা। 'মাধুকরী', 'কোজাগর', 'কোয়েলের কাছে', 'রুআহা', 'সোপর্দ', 'চান ঘরের গান', 'ওয়াইকিকি' আর 'ঋজুদা'র স্রষ্টা তখন তাঁর আতিথেয়তার ষোলকলা সম্পাদন করেছেন। বেশ কয়েকটা এপিসোড ধরে "তারাদের বেড়ানো" দেখিয়েছিলাম আমরা।

তার অনেকদিন পর। বন বিভাগের একটা ভিডিওর কাজ করছিলাম। রাস্তার বুলেভার্ডে গাছ লাগাচ্ছিল বন দপ্তরের আরবান ফরেস্ট্রি বিভাগ। ওই বিভাগের মৈত্রেয়ি দি গুহ স্যার বলতে অজ্ঞান। সব শুট সেরে একটা দিন রাখলাম "গুহ স্যারের" জন্য। ওয়াটারলু স্ট্রীটের অফিসে সময় দিলেন তথাগত। বুদ্ধ মানে তো তথাগতই! একটা সবুজ রঙের পাঞ্জাবী পরে পান জবজবে মুখে পরিচিত হাসি মাখিয়ে বসে আছেন তিনি। আমাদের স্ক্রিপ্টে ওনার জন্য ছিল বাংলা টপ্পা, আর দুলাইন কনজারভেশনের বার্তা। গান শেষ হতে জলখাবার আর চা এল। তারপর পান। তখন পুজো আর কিছুদিন বাকি। বাইরে উজ্জ্বল বর্ষা শেষের আলো। আর পুরনো ফাইলের মধ্যে বসে তাঁর দ্যুতি ছড়াচ্ছিলেন বুদ্ধদেব গুহ।

ময়দানের ইস্টবেঙ্গল কর্তা কল্যাণ মজুমদার রাশভারী মানুষ। কিন্ত লালাদার প্রসঙ্গ উঠলে আবেগে, সম্ভ্রমে গলে জল প্রাক্তন বিমান কর্তা ও সাহিত্যিক কল্যাণ মজুমদার। বুদ্ধদেব গুহ'র স্ত্রী ঋতু গুহ যখন প্রয়াত হলেন প্রায়ই কথা হয়েছে কল্যাণবাবুর সঙ্গে। প্রসঙ্গ বুদ্ধদেব গুহ। ভাঙছিলেন একদা শিকারি পরবর্তী জীবনে সংরক্ষণকামী মানুষটা। তারই মধ্যে একবার দেখা হল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অনুষ্ঠানে। প্রণাম করতে গেলাম, প্রতিবারের মত বললেন, "প্রণাম করো না, প্রণম্য মানুষ আর একশৃঙ্গ গণ্ডার দুটিই বিরল"। হাসিমুখটা আজ বড্ড মনে পড়ছে।

শেষ কথা। টিভি নাইন বাংলার সঙ্গে যুক্ত হবার পর, আমাদের দপ্তরে ঠিক হল বুদ্ধদেব গুহ'র ওপর একটা কাজ হবে। কবি রাহুল পুরকায়স্থ, বস কম, মেন্টর বেশি। রাহুল দার ফোন থেকেই কথা হল। ওপারে তিনি। সবে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন। "কয়েকটা দিন যাক, তারপরে প্ল্যান করো"। আর হল না প্ল্যানটা। আজীবন লিখে এসেছেন মানুষ একলা বাঘের মত বাঁচবে। ভালবাসার প্রয়োজনে কাছে আসবে। জীবনকে সম্পূর্ণ অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শিখিয়েছেন যে শিক্ষক তাঁর নাম বুদ্ধদেব গুহ।

ভাবতে অবাক লাগে তাঁর অজস্র সৃষ্টি। বহু সৃষ্টি মারাত্মক সিনেম্যাটিক অথচ তাঁর জীবদ্দশায় কোনও প্রোডাকশন হাউজ এগিয়ে এল না তাঁর সাহিত্যকে সেলুলয়েডে রূপান্তরিত করতে। মাধুকরীর প্রেক্ষাপট বিশাল কিন্ত 'খেলা যখন', 'হলুদ বসন্ত' বা নিদেন পক্ষে ছোট গল্প 'টাটা' নিয়েও কি করা যেত না কোনও ছবি।

ছেলেবেলায়, নাদানির দিনে যখন পাড়ার লাইব্রেরীতে কার্ড করিয়ে নিয়মিত বই পড়তাম তখন আমরা একটা খেলা খেলতাম। মাধুকরীর কাস্টিং ডিরেক্টর হবার খেলা। আমাদের সেই সময়ে পৃথু ঘোষের চরিত্রে দুটি নাম আসত এক লেখক স্বয়ং আর দুই কমল হাসান, রুষা  রুপা গাঙ্গুলি, কুর্চি শাবানা আজমি। সেই সব খেলার সময় আজ অতীত যেমন অতীত স্রষ্টা স্বয়ং। ভালো থাকুন অমৃতলোকে বুদ্ধদেব গুহ। এক অভয়ারণ্য সবুজ শ্রদ্ধা। 




আমাকে বাঘা বোলো না !



তকাল দেরি করে বাড়ি ফিরেছি অফিস থেকে। বাইকটা তখনও থামে নি। ঘনঘন ফোন আসছিল। মোটর সাইকেল চালালে সাধারণত ফোন ধরি না। তাই বাড়ি পৌঁছে পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম। দেখলাম গ্রামীণ হাওড়ার একজন নেচার অ্যাক্টিভিস্টের ৩টে মিসড কল। আমাকে না পেয়ে তিনি মেসেজ করেছেন, "ডোমজুড়ের করলায় বাঘের আতঙ্ক ছড়িয়েছে" মেসেজের নীচে একটা ভিডিও ক্লিপ। আবার তার নীচে আর একটা মেসেজ সহ ভিডিও "পাঁচলা বেলডুবিতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে"। আতঙ্ক মানুষজনের এমন অবস্থা তাঁরা ভয়ে পিটিয়েও মারতে পারেন প্রাণীটিকে। সেই অ্যাক্টিভিস্টকে ফোন করলাম। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আমাদের রাজ্য প্রাণী ফিশিং ক্যাট (State Animal of West Bengal Fishing Cat )বা বাঘরোল। বন্ধুটিও সহমত। কিন্তু গ্রামবাসীদের বোঝায় কার সাধ্য! আগ বাড়িয়ে তাঁকে বললাম "আমাকে ওনাদের নম্বর দাও, কথা বলব"। আমার পাঁচ বছরের কন্যা সারাদিন পর বাবার দেখা পেয়ে তিড়িং বিড়িং করছে ফড়িং এর মত। তাকে বললাম, "মা একটা গুল্লু বাঘরোলকে দেখে সবাই বাঘ বলে ভয় পেয়েছে! ওঁদের সঙ্গে কথা বলে তোমার সঙ্গে খেলব। নইলে সোনাবাবাটাকে ওঁরা ভয় পেয়ে মেরে ফেলবে"। ও বলল, "কেন মারবে? ওরা তো ভাল"! 

সময় নষ্ট না করে প্রথম ফোন করলাম সমীর মল্লিককে। ওনার বাড়ির দাওয়ায় ঘুরেফিরে বেড়িয়েছে পূর্ণ বয়স্ক ফিশিং ক্যাট, রাতের অন্ধকারে। সিসিটিভি ক্যামেরায় পরিষ্কার ছবি এসেছে। উনি নিশ্চিত ওটা 'বাঘ' জাতীয় কিছু। মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোঝাতে লাগলাম। ওই এলাকায় কোনও মতেই বাঘ আসতে পারে না। মাথার ভিতরে চলছিল -আজ থেকে ২০০ বছর আগে পার্ক স্ট্রিটেও বাঘ ডাকতো,আমরা এতই বুভুক্ষু যে সব খেয়ে ফেলেছি, উন্নয়ন আর নগরায়নের জোড়া চোয়াল দিয়ে চেবাতে চেবাতে এখন জিভটুকুই অবশিষ্ট পড়ে আছে। সমীর বাবুর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে বাঘরোল নিয়ে করা আমার ভিডিও প্রতিবেদনের লিঙ্ক পাঠালাম। বললাম খেয়াল রাখুন প্রাণীটার। ওরা নিরীহ, মৎস্যভুক, লাজুক প্রকৃতির প্রাণী। সাধারণতঃ নিশাচর। উপায় না পেয়ে, বাসস্থান আর খাবারের সংকট দেখা দিলেই তবে লোকালয়ে আসে। ওটাকে মারবেন না। ও যে আমাদের রাজ্যপ্রাণী! পৃথিবীতে রোজ কমছে ওদের সংখ্যা। 

এরপর ফোনে ধরলাম আর এক আতঙ্কিত মানুষ লেনিন বসুকে। তাঁকেও বোঝালাম বললাম। তিনি আজও ফোন করেছিলেন। তাঁদের গ্রামে বন দপ্তর থেকে বন কর্মীরা এসে খাঁচা পেতে দিয়ে গেছেন। ওখানে গতকাল একটা পুকুর পাড়ে মাছের আশায় এসেছিল বাঘরোল। গ্রামের মানুষরা স্বস্তি পেয়েছেন। 
বাঘরোল সম্পর্কে ২টি কথা 

আইএউসিএন লাল তালিকায় সংরক্ষণের নিরিখে অতি সংবেদনশীল আমাদের রাজ্যপ্রাণী- বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাট। ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক ভাবে ফিশিং ক্যাট ফেব্রুয়ারি হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। বাঘরোল, একমাত্র বৃহৎ মার্জার প্রাণী যা জলে ডুবে তার শিকার ধরে। বেড়াল জাতীয় প্রাণী সাধারণত জল এড়িয়ে চলে। অথচ এই বেড়ালের বেঁচে থাকার জন্য জলই হল অন্যতম শর্ত। এদের গায়ে লোমের দুটি পরত এবং অন্য বিড়ালদের তুলনায় দুটি চোখ কাছাকাছি হওয়ায় এদের শরীরের গঠনতন্ত্র আন্ডারওয়াটার হান্টিং এর জন্য অনুকূল। 

২ 
একদিকে উন্নয়ন, কৃষি আর নিবিড় মৎস্যচাষের জন্য রোজই ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক জলাজমি। ফল স্বরূপ বাসস্থান আর খাদ্যের সংকটে পড়ছে বাঘরোল। প্রতি বছর ৩০% হারে হু হু করে কমছে ওদের সংখ্যা।  ওদের আবাসের ৯০% ই লোকালয় সংলগ্ন। আর অন্যদিকে ওদের সম্পর্কে নেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা। তাই ওদের বাঁচাতে গেলে মানুষের সাথে বাঘরোলের সহাবস্থান অত্যন্ত জরুরী।  পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, আর উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাওয়া যায় ওদের। জলাভুমির বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। সে বাঁচলে তবেই ভারসাম্য রক্ষা হবে একটা বড়সড় ইকো সিস্টেমের।  তাই বাঘরোল সংরক্ষণের বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে স্থানীয় যারা নেচার অ্যাক্টিভিস্ট তাঁরা তাঁদের সীমিত সামর্থে যতাটা পারছেন অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। কিন্তু সরকারী দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যাঁরা, মানে বন মন্ত্রকের তরফে সচেতনতা কোথায়? কোথায় হোর্ডিং-এ, ব্যানারে, কাগজে, টেলিভিশনে মানুষকে সচেতন করা অ্যাড ? যেসব জায়গায় বাঘরোলের বাসস্থান সেখানে কি  বন মন্ত্রক থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সচেতনতা ছড়ানো হয়ে থাকে? মন্ত্রকের বরাদ্দ খাতের অর্থগুলো তাহলে ব্যবহৃত হয় কোন খাতে? এ প্রশ্নটা তো উঠবেই। স্থানীয় মানুষ বাঘ আর বাঘরোলের তফাৎ করতে পারছেন না মানে বন মন্ত্রকের তরফ এ কোনরকম উদ্যোগই নেই কি এলাকাগুলোয়? প্রশ্নটা তো উঠবেই। আর উত্তর কোনও কিছু আসবে না তাও জানা। তবুও প্রশ্নগুলো তোলা রইল। কেবলমাত্র ফিশিং ক্যাট ফেব্রুয়ারিতে পোস্টার ছাপিয়ে "সেভ ফিশিং ক্যাট" বললাম; আর বাকি সময়ে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর খুব কম সুবিধাপ্রাপ্ত বন বিভাগের কাঁধে দায় ঝেড়ে ফেলে দিলাম। এ কোন পথে হাঁটছে আমাদের রাজ্যের রাজ্যপ্রানীটির সংরক্ষণের চালচিত্র? কারণ সংরক্ষণ একটি লাগাতার প্রক্রিয়া আর তাতে হাল ছেড়ে দিলেই বিপদ! শুধু প্রাণীটিরই নয় মানুষেরও।  


বাঘরোল সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে



Sunday, August 15, 2021

অ্যান্থেমঃ শুনলেই কান্না পায়!

স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা। আজ বিভিন্ন জায়গায় বারেবারে বাজল যে গান অর্থাৎ জাতীয় সঙ্গীত বা ন্যাশানাল অ্যান্থেম। তাকে নিয়েই আজকের কথা। জাতীয় ফুটবল এবং রাগবি দলের বেশ কয়েকটা ম্যাচে সুযোগ হয়েছিল খেলোয়ারদের জাতীয় সংগীত গাওয়ার মুহূর্তটা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ক্যামেরাবন্দি করবার। সেই সময়ে এবং অন্য সময়ে গ্যালারিতে বসে জাতীয় সংগীত বা কোন অনুষ্ঠানের শেষে ওই গানটা শুনলেই কেন জানিনা দুটো চোখ জলে ভরে যেত, আজও যায়।
মুশকিলটা হল কাজের সময়ে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি ভারত আর ইরানের ম্যাচ শুরু হবে তার আগে টিম লাইন আপ হয়েছে। এবার শুরু হবে রবি ঠাকুরের গান। পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমে ঘোষণা STAND UP FOR NATIONAL ANTHEM OF INDIA. নাক ফোঁসফোঁস আমার শুরু। বুক দুরু দুরু, কাঁধে থাকা ক্যামেরাটা না কেঁপে যায়! কমান্ড আসছে প্যানেল ডিরেক্টরের। ওই সময়ে আমার শট ছাড়াও আরও ৫টা ক্যামেরার শট সুইচ হয়ে একটা মালা গাঁথা হবে। টিম লাইন আপের একপ্রান্ত থেকে শুরু করে মোলায়েম পদক্ষেপে এক একজন খেলোয়াড়কে দেখিয়ে আমি যখন ক্যাপ্টেনের কাছে এসে থামব তখন অবশিষ্ট পড়ে থাকবে জাতীয় সঙ্গীতের "জয় জয় জয় জয় হে"। ব্যাস এটুকুই মাথায়। বুকে টলটলে কান্না। আর মনে আর কিচ্ছু নেই... ব্ল্যাঙ্ক।
আমার ডান চোখটা ঢাকত ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার আর বাম চোখটা খোলা বন্ধ করবার কারণে কোনওদিন জল বেরোত না। তারপর দুইদলের করমর্দন আর টস। একটা অদ্ভুত ঘোর তৈরি হত ম্যাচ শুরুর ওই মুহুর্তে। এত বিচ্ছিরি একটা ভাল লাগা যে তা বারে বারে কাঁদাত। কিছুটা অ্যড্রিনালিন আর বাকিটাকে কী বলে জানি না, দেশপ্রেম কিনা। তবে ওই একটা কাজের জন্য খেলার ক্যামেরা ওয়ার্কে হ্যান্ডহেল্ড না ব্যাগিক্যাম আজও আমার সেরা পছন্দের পজ়িশন। 

অন্য দেশের জাতীয় সঙ্গীত এর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হত। যেমন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত।  কারণ হয়ত ওই একই। রবীন্দ্রনাথ। "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি" এই গানটার "অঘ্রানে তোর আমের বোলের ঘ্রাণে পাগল করে"কানে ঢুকলেই তারপর থেকে শুরু হতো আমার ভেতরে তোলপাড়। বাংলাদেশের ফুটবলারদের অনেকে সেটা লক্ষ্যও করেছেন।  যদিও বহিঃপ্রকাশ থাকত না আমার।  কিন্তু যখন "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিইইইইই"  দিয়ে শেষের স্ট্র্যাঞ্জা শেষ হত চোখে কেন জানিনা একফোঁটা জল চলে আসতই। বারেবারে হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে, বিভিন্ন মাঠে হয়েছে, কারণ জানা নেই। অথচ ওই সময় কী কঠিন ভাবে মনকে সামলাতাম আমি! 

প্রায় এক রকম হত FIFA অ্যান্থেমের প্রথম ৫ সেকেন্ড। ওই গান প্রায় ২০০০ বারের মত শুনেও আজও শুনলে একই রকম দুরুদুরু হয়। 

কোনওদিন একচুলও ভুলচুক হয় নি আমাদের কারও। এটাই স্পোর্টস ব্রডকাস্ট ক্যামেরা ক্রিউতে কাজ করবার একটা শিক্ষা। সিনিয়রদের দেখে একটা পরম্পরাকে ফলো করে বড় হওয়ার অভ্যাস। সারা গ্যালারি যখন অ্যান্থেমের আবহে আবেগে ভাসে। আমরা তখন কনসেনট্রসনের চূড়ান্ত শিখরে। তখন আমরা সেই আবেগের ঘোড়ার লাগাম শক্ত হাতে ধরে তাতে সওয়ার হয়ে ভেসে যাই, হাওয়ার মত, হাসির মত, কুসুমগন্ধরাশির মত। আর আমার মত কিছু নাদান, বাচ্চাকাচ্চা ওই সব দেখে কিছুটা ভয়ে কিছুটা সম্ভ্রমে আর ভাললাগায় কেঁদে ফেলে, এই আর কি। 

Sunday, August 1, 2021

চাইছি তোমার বন্ধুতা- প্রসঙ্গঃ বাংলা বেসরকারি টেলিভিশন

" ব্যাক টু ব্যাক দো টি২০ ম্যাচ, হ্যাণ্ড হেল্ড ক্যামেরা পজিশন। দাদা আপ সে হো পায়েগা না?" ফোনে বলেছিলেন রমেশ সিনহা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে আমাকে বুক করবার সময়ে। টানা ৪০ দিন সেবার কেটেছিল ৩৬টা ক্যামেরা ইউনিটের মাঝে। ডিরেক্টর অস্ট্রেলীয় টিম ফিনলে (Tim Finley)। পকেটে তাঁর অনেকগুলো ওয়ার্ল্ড কাপ আর প্রায় সব কটা আইপিএল ডিরেক্ট করবার  অভিজ্ঞতা। ডিওপি সাউথ আফ্রিকার মরিস ফরি (Marius Fourie)। সঙ্গে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা আর জার্মানির একঝাঁক অভিজ্ঞ ক্রু মেম্বার। "দাদা আপ সে হ পায়েগা"র দোলাচল ভুলে টুর্নামেন্টের ২য় ম্যাচে মানে প্রথম দিনেই ওয়েল ডান বলে গেলেন রমেশ স্যার। ঢাকা, চট্টগ্রাম , সিলেট টৈ টৈ করে কেটে যাওয়া ৪০টা দিন আজও জীবনের অন্যতম সেরা অ্যাসাইনমেন্ট হয়ে থাকবে। 


রোজ ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠে সাতটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট সেরে ক্রু বাসের জন্য অপেক্ষা করা। আর সেই বাসটার দরজা খুলে গেলে প্রতিদিন বাসটায় ওঠার সময়ে রোমাঞ্চ জাগত। যেকোনও প্রফেসনাল ক্যামেরাম্যানের স্বপ্নে থাকে ওরকম একটা বাসে সওয়ার হওয়ার। বাসটা স্টেডিয়ামে থামলেই যে যার কাজে লেগে যাবে। স্ট্যাম্প ক্যাম আর হক আই প্রথমে সেট হবে তারপর স্পাইডার ক্যাম। তারপর ড্রোন। ততক্ষণে একটা কফি নিয়ে ম্যানড ক্যামেরার অপারেটরদের সঙ্গে একটা মিটিং করবেন টিম আর মরিস। সেটা মিটিং কম মজাই বেশি। টিম মানুষটা বেশ মজার। বিশেষ করে ওনার জন্যই ক্রিকেট ব্রডকাস্টের প্রাথমিক জড়তাটা কেটেছিল। বয়স ষাট পেরিয়েছে। প্রথম জীবনে ছিলেন ক্যামেরাম্যান। প্রথম মিটিংয়েই বলেছিলেন। পর পর দুটো ম্যাচ এই কথাটা মাথায় ঢুকিও না। হ্যাব ফান। এণ্ড এনজয় দ্যা গেম। আর আমদের উদ্দেশ্যে মানে আমি আর টিটু র উদ্দেশ্যে বলেছিলেন হ্যাণ্ড হেল্ড ক্যামেরা অকারনে কাঁধে রাখলে আমি মাঠে গিয়ে হাঁটু ভেঙে দিয়ে আসব। রিল্যাক্স করবে, যতটা সম্ভব। বিশ্বাস করুন সব জড়তা কেটে গিয়েছিল। মিটিংয়ের পর মাঠে যে যার পজিশনে চলে যাবে। শুরু হবে ফ্যাক্টস চেক। অডিও, সুপার স্লো মোশান , আলট্রা স্লো মোশান, অ্যাগুমেণ্টেড আর ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গ্রাফিক্স। আর তার দু ঘণ্টা পর ম্যাচ শুরু। ২টো ম্যাচের শেষে শুরু হবে "ডি রিগ"। ক্যামেরা ডিসমেন্টাল করে বক্সে প্যাক করে প্রায় কয়েক কিলোমিটার কেবল গুটিয়ে তারপর সব জিনিসপত্র আসত স্টেডিয়ামের নির্দিষ্ট একটা জায়গায়। নিজেদের কাজ শেষ করবার পর কাজ শুরু হত আমাদের। আমি অয়ন সৌমেন দা আর মরিস। সব ইউনিট আর কেবল মার্কিং করে তা লিপিবদ্ধ করে তবে আমাদের ছুটি হত। 

সব সবসময়ে মাতিয়ে রাখত ড্যানি মরিসন

হোটেলে ফিরে ডিনার পেটে পড়লেই ঘুম আসত। ছুটির দিনে সকালটা কাটত টিভি দেখে। বেশিরভাগ "গান বাংলা"ই দেখতাম। ওদের কর্ণধার তাপস মাঠে আসতেন। দেখা হত রোজই। নিজেও দারুণ মিউজিশিয়ান। তাছাড়াও দেখতাম খবরের সব চ্যানেল গুলো। অদ্ভুত এক সহাবস্থান বাংলাদেশের নিউজ মিডিয়াগুলোর। আমাদের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচার সত্ত্ব বাংলাদেশে ছিল মাছরাঙা টেলিভিশনের আর গ্লোবাল রাইট ছিল ডি স্পোর্টসের। ম্যাচের প্রতিদিনের হাইলাইটস যখন অন্য চ্যানেল দেখাত তখন তারা স্পস্ট লিখত "সৌজন্য মাছরাঙা টিভি"। আমাদের এই বাংলায় দুটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাছাড়াও দেখতাম একটি চ্যানেলে অন্য চ্যানেলের অস্তিত্ব স্বীকার করবার রেওয়াজ। বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে যাবার ফলে একাধিকবার দেখেছি বৈশাখী টিভির জন্মদিনে একাত্তর টিভি ফুলের বোকে পাঠাচ্ছে এবং সেটা খবর হিসাবে প্রচারিত হচ্ছে! ভাবুন বিষয়টা।আর আমাদের এখানে পরিবেশটা এমন যেন এবিপি আনন্দ ভাবে ২৪ ঘন্টা মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা। ২৪ ঘণ্টা মনে করে কলকাতা টিভি এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে থাকে, কলকাতা টিভির কাছে দূর কোনও নক্ষত্রের বাসিন্দা টিভি ১৮। অন্তত চ্যানেল গুলো দেখলে যেন তাই মনে হয়। তখন হোটেলের একাঘরে বসে বসে বারবার মনে হত কেন এমন আমাদের বাংলায়, পশ্চিমবঙ্গে, হয় না। 

দুই বাংলাতেই মিডিয়াকর্মীরা প্রতিদিন একসাথে কর্মক্ষেত্রে থাকে।  ওপার বাংলায় ওরা একসাথে রবার বুলেট আর পেট্রল বোমা বা ককটেল বোমা একসাথেই খেয়েছে । আর এখানেও আমরা লাঠি, টিয়ার গ্যাস বা  স্প্রিন্টার একসাথেই খাই। বন্ধুতা না থাকলে সেটা হয়? এই কিছুদিন আগে ধাপায় গিয়েছিলাম একটা স্টোরি কভার করতে। ধাপার শ্মশান। ওখানে গিয়েই মনে পড়ল আজকালের ফটোগ্রাফার রনি দার কথা। রনি দার নশ্বর দেহটা ওই চুল্লি থেকেই ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিশে গিয়েছিল। বন্ধুত্ব না থাকলে সেটা হয়? শুধুই কি ব্র্যাণ্ডিং। খুব অল্প দিনের সাক্ষাত তবু আজও মিডিয়া সিটির ৩ নম্বর লিফটটায় উঠলেই মনে পড়ে অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখটা। বড় অল্প দিনের মেহেমানরা সব আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। 



আজ এই পয়লা আগস্ট সেই খেদ একটু হলেও মিটল একটা ছোট্ট ছবিতে। এই ছবিটা ঐতিহাসিক একটা দলিল হয়ে থাকল পশ্চিমবাংলার বেসরকারি মিডিয়া ইণ্ডাস্ট্রিতে। দেখুন ব্রেকিং, এক্সক্লুসিভ, সবার আগে খবর ধরানোর লড়াইটা তো থাকবেই। সুস্থ প্রতিযোগিতা উৎকর্ষতা আনেই। তা বলে বন্ধুতা রাখতে দোষ কোথায়? আর বন্ধুতা থাকলে সেই বন্ধুতা স্বীকার করতেও দোষ কোথায়? সেলিব্রেশনের দিন আজ। কি তাই না? তবে দুঃখ একটাই সেটা স্বীকার করতে এতটা দেরি হল। আর আনন্দ একটাই অবশেষে বন্ধুত্বের জয় হল। 


Thursday, May 20, 2021

করোনা যুদ্ধের জন্য কতটা ক্ষতিকর কাকলি ফার্নিচার মিম

করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গে "আসলি হিরো"র নাম কিন্তু ফেসবুক (এবং হোয়াটসঅ্যাপ যা কিনা আদতে ফেসবুকেরই ভগ্নী সংস্থা)। লক ডাউনে সব যখন স্তব্ধ তখন অক্সিজেন, আরটিপিসিআর টেস্ট, অ্যাম্বুলেন্স, খাবার সংক্রান্ত নানান সুলুক সন্ধান (পড়ুন 'লিড') আসছে সোশ্যাল মাধ্যম থেকে। কোথায় সহজে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়। কোথায় সেফ হোম কোথায় কে নেগেটিভ রিপোর্ট দেখলেই খাবারের থালা নিয়ে হাজির হবে। তার সমস্ত খোঁজ এখানেই। 

দিকে দিকে বহু মানুষ লড়ছেন। লড়ছেন স্বার্থহীন ভাবে। লড়ছেন অপরের জন্য। এটাই বোধহয় একটা অতিমারি বা কঠিন সময় দিতে পারে আমাদের। অন্যের জন্য প্রাণপাত করছে মানুষ। ফেলো ফিলিংস আজ আশা দেখাচ্ছে আমাদের, এই অস্থির সময়টা পার করবার জন্য ভরসা যোগাচ্ছে। তারই মাঝে এল কাকলি ফার্ণিচার। টাইমলাইনে সুনামী বয়ে গেল। হরি দা পাঁচ দা থেকে নামিদামী কেষ্ট বিষ্টু সবাই উদ্বেলিত সেই ফার্নিচারের বোকা বোকা মিমে। আর এখানেই একটু পিছিয়ে গেলেন ওই কোভিড যোদ্ধারা। 

কেন বলছি? আপনি হয়ত ভাববেন চারিদিকে মৃত্যু আর আতঙ্কের বিভীষিকা তার মধ্যে দু'দণ্ডের হালকা ছলে মনোরঞ্জন খারাপ কি!  মাথা ঠাণ্ডা করে, আপনার সব বিষয়ে (ভিখিরির চাদর থেকে রাতের আদর) পাণ্ডিত্যের গুগলনামা সরিয়ে শুনুন তাহলে।  

ফেসবুক বা ইউটিউব জাতীয় সোশ্যাল সাইট গুলো চলে একটা অ্যালগরিদম মেনে। কেমন সেই অ্যালগরিদম? তার কয়েটা ফর্মূলা আছে। 
এক) আপনি যা দেখেন মানে যে ধরনের কন্টেন্ট দেখেন(ছবি,পোস্ট বা ভিডিও ) সেই ধরণের কন্টেন্টই আসবে আপনার নিউজ ফিডে। 
দুই) আপনার বন্ধুরা যে ধরণের কন্টেন্ট দেখে তারও কিছুটা প্রতিফলিত হয়। 
তিন) আপনি যাঁদের ফলো করেন তাঁরা যে ধরনের কন্টেন্ট দেখে। 
আর
চার) যে সব কন্টেন্ট ব্যাবসায়িক ভাবে প্রোমোটেড হয় ।

এবার প্রথম তিনটে পয়েন্টের মধ্যে যে কোনটা নিয়ে যদি কথা বলা যায়, ধরুন আপনার নিউজ ফিডে কমিউনিটি হেল্প সংক্রান্ত পোস্ট আসছিল। আপনার মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ছিল অনেকের মধ্যে যাঁরা এগুলো জানতেন না, বা জানতে চান, সাহায্য করতে চান। একটা জনজাগরন তৈরি হচ্ছিল। এর মাঝে হঠাৎ 'কাকলি ফার্নিচার' এসে সেই কমিউনিটি হেল্পের চেইনটাকে নষ্ট করে দিল। খেয়াল করে দেখুন সাম্প্রতিক কালে রেড ভলান্টিয়ার, অ্যাক্টিভ ইউথ, নিউটাউন ফোরাম এণ্ড নিউজ, স্বপ্ন দেখার উজান গাঙ, কেডিস কিচেন বা আনাড়ি কিচেন দের পোস্ট আপনি কম দেখতে পাচ্ছেন। বেশী পাচ্ছেন কাকলি ফার্নিচার। 
অ্যালগরিদম ফারাক বোঝে না। আপনার ক্লিক বোঝে আপনি কী দেখছেন সেটা বোঝে। পারবেন কি এই দায়টা এড়াতে।