Friday, March 23, 2018

পথেই হবে এ পাত চেনা

সত্যজিৎ রায়ের আত্মজীবনীমূলক লেখা যখন ছোট ছিলাম অনেকেরই পড়া। সত্যজিতের ছোট কাকা সম্ভবত সুবিনয় রায় ছিলেন ভোজন রসিক ও বিলাসী। মুখে খাবারের গ্রাস নিয়ে বত্রিশবার চিবোতেন। প্রতিটি খাবারের স্বাদ ডায়রিতে নোট রাখতেন। তো সেই বই তে তাঁর চা বিষয়ক একটি মজার লেখা আছে। মানে এক একরকম চা খেয়ে সেই চা দের চরিত্র বিশ্লেষণ। আগে সেটাই দেখি তারপর মূল লেখায় আসছি।
সত্যজিৎ বলছেন
" ছোটকাকা পেটুক না হলেও খেতেন খুব তৃপ্তি করে। রোজ এবারই ওবাড়ি গিয়ে চা খাওয়ার ব্যাপারটা  ছিল একটা বিশেষ ঘটনা। ডায়রিতে এর উল্লেখ থাকত , তবে মামুলিভাবে নয়। যে চা -টা খেলেন তার একটা বিশেষণ , আর ব্রাকেটের মধ্যে সেই বিশেষণের একটা ব্যাখ্যা চাই। 
একমাসের ডায়রি থেকে বারোটা উদাহরণ দিচ্ছি। ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে --

১) নৃসিংহভোগ্য চা (ভৈরবকান্তি-জনক ,হুহুঙ্কার প্রসাদক ,জোরালো চা )
২) বৈষ্ণবভোগ্য চা (নিরীহ , সুমিষ্ট , সুকোমল ,অহিংসক চা )
৩) বিবেকানন্দভোগ্য চা ( কর্মযোগস্পৃহাবর্ধক , বাগবিভূতিপ্রদ , তত্ত্বনিষ্ঠার অনুকূল উপাদেয় চা )
৪) ভট্টাচার্যভোগ্য চা ( বিজ্ঞতাবর্ধক ,গাম্ভীর্যপ্রদ , অনুগ্র ,হৃদ্য চা )
৫) ধন্বন্তরিভোগ্য চা ( আরোগ্যবর্ধক ,আয়ুষ্য ,রসায়নগুণ-সম্পন্ন চা )
৬) পাহারাদারভোগ্য চা (সতর্কতাবর্ধক , উত্তেজক , তন্দ্রনাশক চা )
৭) মজলিসী চা (মসগুল-মসগুল ভাবোদ্রেককারী চা )
৮) কেরাণিভোগ্য চা ( হিসাবের খাতা দেখায় উৎসাহবর্ধক , বাদামী স্বাদু চা )
৯) হাবিলদারভোগ্য চা  ( হিম্মতপ্রদ , হামবড়াভাবের প্রবর্তক চা )
১০) জনসাধারণভোগ্য চা ( বৈশিষ্টহীন ,চলনসই চা )
১১) নারদভোগ্য চা ( সঙ্গীতানুরাগবর্ধক , তত্ত্বজ্ঞানপ্রসাদক , ভক্তি-রসোদ্দীপক চা
১২) হনুমানভোগ্য চা ( বিশ্বাসযোগ্যতাবর্ধক , সমস্যা-সমুদ্রলঙ্ঘনের শক্তিদায়ক , বিক্রমপ্রদ চা ) "


ছোট থেকে যতবার যখন ছোট ছিলাম পড়েছি এই জায়গায় এসে হাসি চাপতে পারি নি। কী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ !!! কাজেই চা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ওই লাইনগুলো আগে খেলে যায় মাথায়।
আজ আবার একটা পুরোনো প্রকাশিত লেখা দিচ্ছি। লেখাটা লিখে আরাম পেয়েছিলাম। হুবহু তুলে দিলাম

এক কাপ চায়ে আমি...
প্রকাশিত হয় হ্যাংলা হেঁশেল সংখ্যা ৩১ এ
বিভাগ : পথেই হবে পাত চেনা
প্রকাশকাল : মে ২০১৫




কোন পথে যে পাত পাড়া আর কোন পথে পাতকুয়ো তার জরিপ করতে করতেই জিন্দেগি পার হয়ে যায়। হু হু করে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা হয় বিমের আলোয় সরে যায় সময় ,নড়ে যায় গন্তব্য। গতি কমিয়ে আমার লো বিম অফ দিই। আসুন সময় , মেপে নিন আমায়। আমার সবটা দিয়ে থামালাম চাকাগুলো। এটাই আমার গন্তব্য ! সত্যিই কি তাই ? আসলে এখন যেটা গন্তব্য বলে ভাবছি দুদিন বাদে সেটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যাব অন্য আস্তানায়। এরই নাম জীবন , এটাই পথ। একটা পদক্ষেপ থেকে আর একটায় হেঁটে যাই , ভেসে যাই , উড়ে যাই। এ চলা অনন্ত অবিরাম। চলেছি , চলেছি চলেই চলেছি। চলতে চলতে চালাক হয়েছি কিনা জানি না চালু হয়েছি। ঠিক ওই রাস্তার পাশের অবহেলায় পড়ে থাকা চা-এর দোকানের মতো ভাঁড়ে মা ভবানী বা গরম চায়ের ছ্যাঁকা খেয়ে সূচের ছিদ্র খুঁজেছি। ছোটবেলায় বাড়িতে বাবা মা চা থেকে বহুদূরে হরলিক্স , ভিভা , বোর্নভিটা , মলটোভার কাপে কয়েদ করে রেখেছিল।  বোনকে তো এমন থ্রেট দেওয়া হয়েছিল যে ,'চা খেলে মা মরে যায় ' !! শৈশবের সেই শঙ্কা সারা জীবন আমার ছোট বোনকে নটি ( No Tea )-র দলে , মানে না-চা-র দলে রেখে দিল। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর কলেজ ক্যান্টিনের গোপালদার হাতে প্রথম স্বাদ পেলাম অমৃত পেয়ালার ! তারপর কত চলেছি আর ক্লান্তির প্রহরগুলোতে চার্জ আপ করেছে চা। এ এক অদ্ভুত পানীয়। শহর বা মফঃস্বলের তামাম আনন্দঘন মুহূর্ত থেকে স্বজনবিয়োগের অশ্রুসজল ব্যাথার প্রহর -- সবটা জুড়ে রয়েছে চা। কত শবের সঙ্গে শ্মশানযাত্রী হয়েছি। তার মধ্যে বেশিরভাগই পরিচিত বা আত্মীয়দের।  কিন্তু বিশ্বাস করুন ওই করুণ আবহতেও যখন দেখি বড় পিসেমশাই আর সেজ জ্যাঠার মধ্যে কে শ্মশানবন্ধুদের চা খাওয়াবে তাই নিয়ে হুড়োহুড়িটা রীতিমতো প্রতিযোগিতার পর্যায়ে চলে গেছে তখন অবাক হয়ে মৃত্যুর নির্মোক ছেড়ে জীবনমুখিতায় ফিরি। মৃতের ফুলমালা , খাট ,খৈ-এর দোকান গভীর রাতে খোলাতে হলেও বাজি ধরে বলতে পারি বারুইপুর থেকে বজবজ , বাটানগর থেকে ব্যারাকপুর বা আসানসোল থেকে আদ্দিস আবাবা শ্মশানের সামনের চায়ের দোকান খোলা থাকবেই। শুধু কলকাতা জুড়ে চা নিয়ে যে উন্মাদনা তা নিয়ে গোটা একটা বই লেখা হয়ে যেতে পারে। পার্ক স্ট্রিটে T3 ( The Tea Table) এখন নেই কিন্তু অক্সফোর্ড বুক স্টোরের ওপর চা-বার (CHA BAR) আর দক্ষিণাপনে প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ত্ব ডলি বসুর Doly's Tea চা বিলাসী কলকাতার পপুলার ডেস্টিনেশন।
ময়দানে অবসরের সান্ধ্য চা 

জলপাইগুড়ি থেকে জয়নগর কত হরিদা ,মানু ভাই , রায় জি ,পাঁড়ের হাতে যে চা খেয়েছি তার শেষ নেই। আর দোকানে যদি পুরুষের বদলে প্রৌঢ় মহিলা থাকেন তাহলে অনায়েসেই মাসির আপ্যায়নে প্রজাপতি ,লেড়ো বা মেরি বিস্কুটের সঙ্গে কাচের গ্লাসে বা মাটির ভাঁড়ে কত ঝোড়ো প্রহর ফুস করে উড়ে চলে যায়। বেকার বয়েসে আমাদের আড্ডা ছিল হরিদার দোকানে। অপরিসর, ম্লান আলোমাখা মফঃস্বল রেল শহরে চারটে বেঞ্চ অপেক্ষা করে থাকত আমাদের আড্ডার সাক্ষী হতে। শুক্রবার , শুক্রবার হাট বসত। আর হাট শেষ করে যখন হাটুরেরা বাড়ি ফিরত তখন ভাঁটিখানায় ভিড় বাড়ত। তারপর মাতালদের চিৎকারে কান পাতা দায় হত। একবার এক কপাল পর্যন্ত নেশা করা মাতাল কী কুক্ষণে যেন হাজির হল হরিদার দোকানে। আর যায় কোথায় !! সবাই মিলে সেই লোকটাকে সাত - আটটা ছানার জিলিপি আর চা বলে এক কাপ জিলিপির রস খাইয়ে ছাড়ল। ছাড়ল কোথায় ! চা ভেবে সেই রস খেয়ে সেই চাতালরূপী মাতাল মাঝরাত অবধি পড়ে রইল হরিদার দোকানের সামনে। পরে ভেবেছি এরকম প্রতারণা না করলেই বোধহয় ভাল হত। 
ক্যানিং স্ট্রিটের এক প্রাচীন টি বয়লার 
  ঘুম চোখে উঠে চা -এর চাহত এ আঁকুপাঁকু করত হো চি মিন সিটিতে। দুধ চা বিরল ভিয়েতনামে। চা বলতে যা পাওয়া যেত তা হলদেটে ঠান্ডা ট্যালটালে এক পানীয়। দিন ১৫র ভিয়েতনাম সফর শুধু ওই প-চা জিনিসটার জন্যই বিরস কেটেছিল। আমার চা নিয়ে আদিখ্যেতার জন্য আর এক চায়ের সঙ্গে পরিচয় হল লেহ শহরের বাইরে সে TSE তে ( এই সে তে 'দিল সে ' সিনেমার টাইটেল সং এর শুটিং হয়েছিল ) লবজুং নোমাঙ্গ এর বাড়িতে। শুধু চা এর জন্যই সে এক ঢালাও আয়োজন। গরম জল, নুন ,মাখন আর চা পাতার মিশ্রণ সুদৃশ্য বাঁশের খোলে পিস্টনের ওপর নিচ করে তৈরি হয় গুটিগুটি চায়ে বা গুড়গুড়ি চায়ে। পোর্সেলিনের নক্সা করা পেয়ালায় সুন্দর তিব্বতি টুলে রাখা টিকোজি ঢাকা পিরিচ থেকে সেই চা ঢালতে ঢালতে বাদশাহী মেজাজ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারির নলেন গুড়ের দার্জিলিং চা 
 এরকমই চলার পথে একটা  ঘটনা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা। তখন আমি মেদিনীপুরে। একটি বেসরকারি ন্যাশনাল চ্যানেলের চিত্রগ্রাহক। ছোট আঙারিয়া কাণ্ডের সপ্তাহখানেকের মধ্যে নির্বাচনী আধিকারিকরা গ্রামে ঢুকছেন , সাথে আমরাও। লোকজন ক্যামেরা দেখে দৌড়ে পালাচ্ছে ঘরের ভিতর। পড়ে থাকছে ভাত ডাল মাখা থালা। এরকম অবস্থায় ছবি করে কাজ মিটিয়ে দেখি গ্রামের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট ঝুপড়ি। তার বারান্দায় একটা মাটির উনোন। বুঝতে বাকি রইল না ওটাই গ্রামের রাজনৈতিক মত বিনিময় কেন্দ্র -- চায়ের দোকান। হাঁকডাক করতে ভয় ভয় চোখে একজন বেরিয়ে এল। অনেক অনুরোধ , উপরোধ , অনুনয়, বিনয় করে ছবি না তোলার প্রতিশ্রুতি দিতে সে গুড়ের চা খাওয়ানোর আশ্বাস দিয়ে বলল - ' একটু আসি পাঁচ মিনিটেই ফিরব। ' পনেরো কুড়ি মিনিট পরে পাশের ঝোপ থেকে শুকনো কাঠকুটো এনে মাটির উনুন এ আঁচ দিয়ে , জলে গুড় মিশিয়ে  চা জাতীয় কিছু একটা সেই মিশ্রনে ফুটিয়ে গ্লাসে ছেঁকে দিয়ে বলল - "বাবু কবে সব ঠিক হবে ?" উত্তরটা দিতে পারিনি। অনেক কিছুই করা হয় নি। জানা হয়নি। রাখা হয় নি অনেক প্রতিশ্রুতিই। কাপ আর ঠোঁটের ব্যবধানটা রয়েই গেছে চরাচর জুড়ে , জীবন জুড়ে।  তবে প্রাণের আরাম আনা ক্লান্ত শরীরকে চাঙ্গা করা চা পরিবেশনকারী অবহেলার সরাইখানাগুলো যেন বেঁচে বর্তে থাকে। বাঙালির  স্বাস্থ্যের আর প্রতিবাদের র(Raw) চা এর পাশে যেন সগর্বে বাঁচে দুধ চিনি মেশানো প-চা টাও।
সেদিনই একটা হাসপাতালের আউটডোরে বসে আছি দেখি একটা কিশোর বয়সী ছেলে চায়ের কেটলি হাতে হুঙ্কার দিচ্ছে - " উপরওয়ালানে শোনে কে লিয়ে জিন্দেগি দিয়ে হ্যায় ! দুনিয়াওয়ালোনে খাটনে কে লিয়ে মজবুর কিযে হ্যায়। " সবাই চনমন করে উঠল। এই মুন্না এদিকে এক কাপ লিকার দে !!

মন বলে চাই চাই চা ই গো 

Thursday, March 22, 2018

জল পাই কোথায় , বলতে পারেন !!!! World Water Day | A gentle reminder

তখন সবে ট্রাভেল ট্যুরিজম জার্নালিজম শুরু করেছি। বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়লো। প্রায় দেড় মাসের অ্যাসাইনমেন্ট পেলাম অমরনাথ যাত্রা আর লাদ্দাখ। অমরনাথ এর হিমশীতল জ্যোতির্লিঙ্গ কভার করে শ্রীনগর হয়ে মানালি ফিরে মানালি থেকে রোটাং পাস দিয়ে ঢুকলাম প্যারাডাইস ও আর্থ লাদাখে। ৩ দিনের কোয়ালিস সফর। দিনে গাড়ি চলবে থেমে থেমে। আর সন্ধ্যের মধ্যে ঢুকে পড়তে হবে দিনের গন্তব্যে। থেমে চলার কারণ শুট করতে যত বেশি সময় পাওয়া যায়। তার ফলে খুব ভোরে উঠে আমরা তৈরী হয়ে নিতাম। সূর্যোদয় কখনো চলন্ত গাড়ি থেকে কখনো রাস্তার মাঝে পেতাম। এখানে বৈচিত্রময় প্রকৃতি,মানুষ ও নানান রকম। মোরেই মালভূমি, দুপাশে ধু ধু করছে তৃণভূমি প্রায় ৩০ কিমি রাস্তা চোখের সামনে খোলা এমন সময় দূরে দেখা গেল ধুলো উড়িয়ে কালো কিছু এগিয়ে আসছে। একটা দল বা ঝুন্ড জাতীয় কিছু। ড্রাইভার গাড়ির গতি কমালেন। সাথে ছিলেন ভ্রমণ পত্রিকার ফোটোগ্রাফার কমলেশ কামিলা। কমলেশ দা বললেন ,"ভয় পেয় না ওরা চাংপা, পশমিনা উল তৈরী হয় যে ছাগল থেকে সেই ছাগল চরায়। যাযাবর ওরা, সব আছে কিন্তু এখানে জল নেই। তাই গাড়ি দেখলেই ছুটে আসে যদি কিছু জল পায় ট্যুরিস্টদের থেকে। " অবাক হয়ে ভিরমি খেয়ে সে এক যা তা অবস্থা আমার। ওরা এল। গাড়ির কাঁচ নামলো। শুকনো মুখ , ফাটা ঠোঁট , হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে জল চাইছে। আমরা গাড়ির দরজা খুলে নেমে যতটা সম্ভব জল ওদের দিলাম। হাত নাড়তে নাড়তে বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে ওরা মিলিয়ে গেল।


যদিও পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে জলের অস্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীর এক ভাগ স্থল তিন ভাগ জল আমরা জানি।  কিন্তু সেই জলের তিন চতুর্থাংশ মেরু বরফ হিসেবে বন্দী। বাকি জলের কেবল মাত্র ২.৫%   স্বচ্ছ , পেয়। এই জলের ওপর দখলদারি নিয়েই মধ্য প্রাচ্যে যত যুদ্ধ , যত অশান্তি সেই ১৯১৮ থেকে এক শতাব্দী কেটে গেল কিন্তু জল নিয়ে কেউ এক চুল ও মাটি ছাড়তে নারাজ। চীনের জনসংখ্যা মোট পৃথিবীর লোকসংখ্যার প্রায় ১/৪ ভাগ। সেই চীনেও প্রায় ৯০% জল ভয়ঙ্কর ভাবে দূষিত। তাই পৃথিবীর তাবড় অর্থনীতিবিদদের মতে আগামী ২০২৫ নাগাদ পেট্রো তেলের চেয়েও মহার্ঘ্য হবে পরিষ্কার পানীয় জল। যেহেতু মেরু বরফের তুষার রাজ্য সাইবেরিয়ার অধিকাংশ চীনে তাই আগামীতে H2O র লার্জেস্ট প্রোডিউসার হবে চীন। আর মেরু বরফের মধ্যে শীতঘুমে অতি প্রাচীন থাকা ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া সেক্ষেত্রে আবার সজীব হয়ে কী ধ্বংস লীলা দেখায় সেটা ভেবেও চিন্তার ভাঁজ পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কপালে। 



খাস কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০০ টি ওয়ার্ড বেশ অতি মাত্রায় আর্সেনিক আক্রান্ত। WHO র বেঁধে দেওয়া আর্সেনিকের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে শহরের জলে।  কল্লোলিনীর শরীরে ছড়াচ্ছে বিষ। উত্তর কলকাতার জলের গুনগত মান হ্রাস পাবার কারণ হিসেবে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দুষছেন রাজারহাটের তীব্র নগরায়ানকে। এর সাথে দোসর হয়েছে মূল শহরের নতুন নির্মাণ। যদি একটি সাবেকি বাড়ি ভেঙে তৈরী হয় একটি বহুতল সেক্ষেত্রে ওই একই জায়গায় জলের চাহিদা হঠাৎ করে বেশ কয়েক গুন্ বেড়ে যায়। যেহেতু আগের থেকে বেশি মানুষ ওই একই জায়গায় থাকছেন তাই ভূগর্ভ থেকে চোঁ চোঁ করে তুলে আনা জলের পরিমাণও বাড়ছে। যতটা উঠছে সে তুলনায় ক্ষতিপূরণ হচ্ছে না। কারন নগর পরিবেশে বাড়ির চারপাশের অধিকাংশ অঞ্চলই কংক্রিটে ঢাকা। তার ফলে বৃষ্টির জল বা অন্য কাজে উদবৃত্ত জল মাটিতে মিশে মাটির গভীরে যাবার সুযোগ পাচ্ছে না। বরং কংক্রিট বেয়ে নালিতে মিশে চলে যাচ্ছে নদীতে, সেখান থেকে সাগরে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা একে জলের অপচয়ই বলছেন।


পশ্চিমবঙ্গের মালভূমি অঞ্চল , বাঁকুড়া , পশ্চিম মেদিনীপুর , পুরুলিয়া ছাড়াও উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলা শুখা মরসুমে জলকস্টে ভোগে। পুরুলিয়া বাঁকুড়া র এমন জনপদও রয়েছে যেখানে জলের যোগান পেতে রোজ ৫-৬ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। তাই NABARD এর সহযোগিতায় শুরু হয়েছে এক লক্ষ গ্রামকে চিহ্নিতকরণের কাজ। যে গ্রামগুলিতে জলকষ্টের তীব্রতা মাত্রাতিরিক্ত। ২০১৬ এ  ৪০০০০ গ্রাম থেকে দারুন সাড়া পাওয়া গেছে।
তবে কী দায়িত্বটা শুধুই সরকারী সংস্থা গুলির , নাবার্ডের ,হু র। আমাদের কিছুই করার নেই !!
আমরা দেখেছি একটি নরম পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থা দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফরতাবাদে ভুগর্ভস্থ জল কী যথেচ্ছ ভাবে তুলে নিয়েছিল। ফলস্বরূপ আশপাশের চাষের জমি শুকিয়ে গিয়েছিলো। অঞ্চলের মানুষজন এর প্রতিরোধের তীব্রতায় নড়েচড়ে বসে বহুজাতিক কোম্পানিটি। এসব অতীত। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

 কিন্তু আগামী দিন গুলো কেমন ? কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে জলের অপচয়। কিছু সহজ উপায় বাতলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
১. অতিফলনশীল নয় স্থানীয় ফসল চাষ করুন যে ফসল এর ভ্যারাইটিগুলো প্রাকৃতিক ভাবেই কম জল টানে। মনে রাখবেন MORE CROP MORE DROP . বাগানের গাছের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। রাসায়নিক ছাড়া চাষ করুন। জৈব সার ব্যবহার করুন।
২. রোজকার বাড়ির কাজে যত কম পারেন রাসায়নিকের ব্যবহার করুন। আর যদি রাসায়নিক ব্যবহার করতেই হয় সেগুলো সঠিক স্থানে ফেলুন ,কখনই মাটিতে ফেলবেন না।
৩. খেয়াল রাখুন যাতে বাড়ির ব্যবহার্য রং , ওষুধ , মোটর অয়েল , ইঞ্জিন অয়েল সরাসরি মাটিতে না মেশে।
৪. ফ্রিজের ব্যবহার কমিয়ে মাটির জালা বা কুঁজো ব্যবহার করুন। জলের অপচয় কম করুন। ব্রাশ করতে করতে ,বা দাড়ি কাটতে কাটতে বেসিনের ট্যাপ বন্ধ রাখুন।
৫. বাড়ির ছাদে জলের ট্যাঙ্কে অটোকাট বাজার লাগান। যাতে জল ভরে গেলেই পাম্প বন্ধ হয়ে যায়।
 সারা বাড়ির জলের লাইনের নিয়মিত পরীক্ষা করান প্লাম্বারকে দিয়ে। কোন কল, সিস্টার্ন, ভালভ দিয়ে যেন জল নষ্ট না হয়ে যায়। যাঁরা বাস্তুশাস্ত্র বিশ্বাস করেন তারাও বলেন জল নষ্ট হওয়া খারাপ বাস্তুর লক্ষণ। আপনি আপনার আগামীর কথা ভেবে করুন। পারলে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ও পরবর্তীতে সেই জল ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
৬. স্নান ,কাপড় কাচা প্রয়োজন। ওগুলোকে বিলাসিতা করে ফেলবেন না। ৫ মিনিটের বেশি স্নান মানে আপনি ক্ষতি করছেন ,এটা মাথায় রাখবেন।
৭. দিনের ঠান্ডা সময় গুলোতে অর্থাৎ ভোরে আর সূর্য ডোবার ঠিক পর বাগানের লনে আর গাছে জল দিন।
৮. কাগজ ,প্লাষ্টিক , কার্ডবোর্ড ,কাচ রিসাইকেল করুন। যে সব জিনিস তৈরিতে বেশি জল লাগে চেষ্টা করুন সেগুলো কম ব্যবহার করতে।
৯. লেবুর রস , বেকিং সোডা বা ভিনিগার দিয়ে কী দারুন ঘর পরিষ্কার হয় জানেন!! রাসায়নিক ক্লিনারের বদলে ওগুলো ব্যবহার করুন। রুম ফ্রেশনারের বদলে ধুপ , বডি স্প্রের বদলে আতর ব্যবহার করুন। আরও পরিবেশ ও জল বান্ধব বিকল্প খুঁজুন।  নিজে জানুন অপরকে জানান।
১০. GROUNDWATER RECHARGE, RAIN WATER HARVESTING বা  WATER DONATE এর ব্যাপারে জানুন ,বাড়ির শিশু ও মহিলাদের জানান , বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

শুধু মাত্র  HAPPY WATER DAY না বলে চলুন এই অঙ্গীকারগুলো আমরা সবাই আজ থেকে অভ্যাসে পরিণত করার শপথ নিই। তবে যদি আগামীকাল ভাল থাকে। অলরেডি অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করব না আমরা।

Wednesday, March 21, 2018

আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি, এতে রাম রাবণ আছে .......

পুতুল নাচ আমাদের বয়সী মানুষ জন অবশ্যই এক বার না এক বার দেখেছেন ছোটবেলায়। আমাদের দেশে পুতুল নাচের বিরাট এক ঐতিহ্য মন্ডিত ইতিহাস আছে। মধ্যযুগে অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যে পুতুল নাচের উল্লেখ পাওয়া যায়। শুধু মাত্র শিশুদের খেলনা ছাড়াও সচেতনতা ও সামাজিক বার্তা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে এবং রামকৃষ্ণের ভাষায় 'লোকশিক্ষা ' র হাতিয়ার হিসেবে পুতুল নাচের ভূমিকা চিরায়ত। মূলতঃ স্বল্প শিক্ষিত প্রান্তিক গ্রামীণ মানুষ জন, যাদের বাস মাটির খুব কাছে তাদের অবকাশ বিনোদনের হাত ধরে বেঁচে রয়েছে এই আর্ট ফর্মটি। নেই কোনো সামাজিক স্বীকৃতি , কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা। রয়েছেন  কিছু প্রান্তিক মানুষজন আর তাদের নেশাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে। এদিকে রয়েছে বর্তমান সময়ে বিনোদনের হাজারো মাধ্যম , আর তাদের চোখ ধাঁধানো উপস্থাপনার মোড়ক।  ধাক্কায় পিছোতে পিছোতে প্রায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে এই শিল্প মাধ্যমটির।

বাঙলার পুতুল নাচের আসর আর এখন বসে না মফঃস্বলে। অথচ কী গৌরবান্বিত এই সংস্কৃতি ! বেণী পুতুল, ডাঙের পুতুল, তারের পুতুল, চদর বদর , সুতো পুতুল ,বনরাকু, ছায়া দিয়ে পুতুল নাচ আরও কত কী।  সহজ সরল উপস্থাপনা সরাসরি সংযোগ করে দর্শকদের সাথে। ছোটদের সাথে সাথে তাজ্জব বনে যায় বড়রাও ! পুতুল কথা বলে! হ্যাঁ আমি ভেন্ট্রিলোকুইজম এর কথা বলছি।
ধূমকেতু পাপেট থিয়েটারের প্রাণ দিলীপ মন্ডল ও তাঁর কথাবলা পুতুল 


সৌনাভ সেনগুপ্ত র সাথে অনেক দিনের পরিচয়। মিরাক্কেল এ সবে তখন ও কাজ করেছে। খেল @ ১১ বলে একটা খেলার অনুষ্ঠানে Anchor করবে সৌনাভ। আমি ক্যামেরা র দায়িত্বে। সেই শুরু কাছ থেকে নারদ কে দেখা। নিজে দিনের খবর জেনে নিয়ে স্ক্রিপ্ট করত সৌনাভ।  নারদ (সৌনাভ র পুতুল - আমরা বলি অল্টার ইগো ) আর সৌনাভ করত উপস্থাপনা। ললিত মোদী কান্ড , গ্রেগ চ্যাপেল কান্ড , বি সি সি আই এর অন্দর মহল এর খবর। যে কথা গুলো কোনো নিউজ চ্যানেলে সৌনাভর মুখ দিয়ে বললে নির্ঘাত মানহানির মামলা হত সে গুলো নারদ এর মুখে পড়তেই পেটে খিল ধরানো হাসির রোল। রোল চলতে চলতে আমরা ফ্লোরে মুখ বন্ধ করে হাসতাম। এই হচ্ছে পাওয়ার অফ পাপেট। কখনও নারদ গাইত গাজীর গান কখনো সারে জাহাঁ সে আচ্ছা। বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে নারদের মত এত ধারালো ক্রিকেট উপস্থাপক বোধহয় আসে নি। ভেন্ট্রিলোকুইজমকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে ওরা দুজন ! নাকি একজন ! না বোধহয় দুজনই।
নারদ ও সৌনাভ সেনগুপ্ত  Khel @11 এর সেটে 


পুতুল নিয়ে এতো কথা বলছি কারণ আজ বিশ্ব পুতুল দিবস। পুতুলদের জন্য আজকের দিনটা। ১৯৯৩ থেকে ২১শে মার্চ পালিত হয়ে আসছে পুতুল দিবস। প্রখ্যাত পুতুলিয়া সংগীত নাটক একাডেমি বিজয়ী  দাদি পুদুমজি র পরামর্শে UNESCO র পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০২ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে পুতুল দিবস।
আমাদের শহর কলকাতায় রবীন্দ্র ভারতী পশ্চিমবঙ্গ নৃত্য নাটক সংগীত ও দৃশ্যকলা আকাদেমি আজ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দ্বারকানাথ মঞ্চে উদযাপন করল এই দিন। দুপুর ৩তে থেকে শুরু হল বিভিন্ন পুতুল নাটক। কোনোটায় বার্তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ,কোথাও পরিবেশ সচেতনতা ,কোনোটায় আবার বন ও বন্য প্রাণী রা এগিয়ে এসে বলছে "কী করছো তোমরা ! বন বাঁচাও তবে তো তোমরা বাঁচবে "



পাখি পুতুল 

বাঘ বাঁচাও 

বাতাসে অক্সিজেন কমছে  

দড়ি ধরে টানলেই  তালপাতার সেপাইয়ের হাত পা নড়ে !!!

বগুলা থেকে পুতুল নিয়ে এসেছিলেন প্রবীণ শিল্পী রঞ্জন রায়। শ্রীমা পুতুল নাট্য সমাজ নাম একটি দল চালান রঞ্জন বাবু। সুতোর পুতুলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ দেখলে চোখকে বিশ্বাস করা যায় না। পুতুল টিকে নিয়ে জিমন্যাস্টিক্স দেখানোর দৃশ্য মঞ্চে শেষ হতেই দর্শকদের করতালিতে ফেটে পড়লো দ্বারকানাথ মঞ্চ। বগুলার মুড়াগাছার এই অসামান্য শিল্পীর কিছু মুহূর্ত রইল। 
অভ্যাস করছেন রঞ্জন রায় 











                                                         জিমন্যাস্টিক্স করছে পুতুল



বাংলার পুতুলনাট্য কর্মীরা সমবেত হয়ে এক ছাতার তলায় এসে তৈরি করেছে 'পাপেট মঞ্চ' সেই সংস্থার উদ্যোগে এই আয়োজন কিছু কচি কাঁচা সজীব মনকে শেখাল জীবনটা আসলে পুতুল খেলারই আসর। আমরা সবাই এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।কার সুতোয় কখন কে টান মারে কেউ জানে না!!!



   

তোর্সা পাড়ের বৃত্তান্ত

তোর্সা পাড়ের বৃত্তান্ত 
প্রকাশিত লেখা  : হ্যাংলা হেঁশেল (সংখ্যা ০২) , নভেম্বর ২০১২







'শুনেছি উত্তরবঙ্গে নাকি ইলেকট্রিক শক চালিয়ে মাছ ধরা হয় ?' প্রশ্নটা শুনে জলপাইগুড়ির মৎস্যপ্রেমী পুলাকদা একটু বিরক্তই হলেন।  বললেন , ' উত্তরবঙ্গের মাছ সম্বন্ধে শুধু এটাই জিজ্ঞাস্য হল ! আর কিছু নেই ? তিস্তা , তোর্সা , জলঢাকা , রায়ডাক , বালাসন , মূর্তি , মাল ,মহানন্দা জুড়ে যে অজস্র মাছের বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে , তা জানতে না চেয়ে শুধু এটা !' হ্যাঁ এভাবে কেউ কেউ বেআইনি উপায়ে পাথরের তলায় লুকিয়ে থাকা ট্যাংরা আর ভাম মাছ ধরছে। তবে এটা কখনই মূল পন্থা নয়। আমাদের নদী, পুকুর, বিল , ডোবায় প্রচুর জেলে চিরাচরিত প্রথা মেনেই মাছ ধরছে। শোল , বোয়াল ,আড় ,সরপুঁটি ,ট্যাংরা ,চিতল ,পাবদা ,রিঠা ,বাচা এখানকার নদী ,নালা ,বিল ডোবায় ভর্তি। আর রয়েছে উত্তরবঙ্গের গৌরব বোরোলি। কেউ কেউ অবশ্য আদর করে বৈরলি বলেও ডাকে। বোরোলি মাছের সবচেয়ে সুস্বাদু প্রজাতিটি পাওয়া যায় কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জে। এ ছাড়াও কোচবিহারে চাপিলা বলে আরও একটি মাছ পাওয়া যায়। বোরোলি অনেকটা মৌরলা মাছের মত দেখতে , তবে আকারে মৌরলার থেকে একটু বড় আর খুব ডেলিকেট। '
পুলাকদার সঙ্গে আড্ডা চলছিল ,এমন সময় দু'কাপ চা হাতে বৌদি এসে বললেন , কাঁচা মাছ নিয়ে তোমার দাদার কারবার , তা শুধু মাছ চিনলেই হবে ? বোরোলির সবচেয়ে সোজা , অথচ অভিজাত রেসিপিটা টুকে নাও , কাজে লাগবে।

বোরোলির পাতলা ঝাল   
পরিষ্কার করে ধোয়া ১৫০ গ্রাম বোরোলি মাছ ,
দেড় চামচ আদাবাটা ,
১/২ চামচ গোটা কালোজিরে
৪-৫ টি কাঁচালঙ্কা মাঝখান থেকে চেরা
১/২ চামচ রসুনবাটা ,
১ চামচ পিয়াঁজবাটা ,
১ টি কুঁচোন টমেটো ,
ধনেপাতা ,
নুন স্বাদ মত
হলুদগুঁড়ো সামান্য

করে অল্প তেল দিয়ে গরম করে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে আদা , রসুন, পিয়াঁজ বাটা অল্প নেড়ে নিয়ে মিশ্রনটায় হলুদ নুন দিয়ে জল ঢালতে হবে। জল অল্প অল্প ফোটা শুরু করলে বোরোলি মাছ , টমেটো কুচি আর চেরা লঙ্কাগুলো দিয়ে কড়াইটা চাপা দিয়ে কম আঁচে রান্না করতে হবে। মাঝে মাঝে ঢাকনা সরিয়ে দেখে নিতে হবে জল যেন পর্যাপ্ত থাকে। নামানোর আগে ধনেপাতা দিয়ে গরম গরম তুলাইপাঞ্জি চালের ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করতে হবে।
ভাবলাম গল্প হলেও সত্যি ! যেন সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা তুলাইপাঞ্জি বেড়ে তার ওপর বোরোলি ঢেলে ভ্যানিশ হয়ে গেলেন। গন্ধে পুরো মম চিত্তে নিতি নৃত্য। কুলকুচি করার পরও স্বাদ লেগে থাকে জিভে ,তালুতে, টাকরায় !!
বৌদিকে বললাম 'এ তো খুব সহজ রান্না। ' বৌদি বললেন সহজ কাজটা সহজ ভাবে করতে পারাটা সহজ না , দক্ষতা লাগে আর লাগে আন্দাজ। ' বৌদি চলে যেতে পুলাকদা বলছিলেন বাচা মাছের কথা। কীভাবে ওরা পদ্মা থেকে ওপরে এসে এই উত্তরবঙ্গে ডিম পেড়ে আবার পদ্মায় ফেরে সেই পরিযান বৃত্তান্ত। আবার স্থানীয় ভাষায় 'খোকসা ' বলে এক ধরনের স্বাদু মাছ পাওয়া যায় , যারা জল বাড়লে নদী-নালায় দেখা যায় তাদের কথাও শুনলাম। পরিযায়ী মাছেদের মধ্যে আর একটি হল 'চাপিলা '
প্রথম বর্ষায় আর শীতে কোচবিহারের নদী ভরে ওঠে এই চাপিলায় , জানলাম। আর জানলাম 'রায়চ্যাং ' বলে আর একটি নদী পরিযায়ী মাছের কথা।


'বোরোলি ভাজা আর টি-ভদকা ককটেল পুরো নাদিম শ্রবণ জুটি গো ', বললেন পুলাকদা।
'সেটা কেমন?' জানতে চাইলাম।
শুরু করলেন পুলাকদা ,
টি -ভদকা : রেসিপি 



'ভদকার বোতলে মকাইবাড়ি চা এর দুটো টি -ব্যাগ ডুবিয়ে মিনিট পাঁচেক রাখো আর ততক্ষণে ঝিরিঝিরি করে মিহি কুঁচোনো পিঁয়াজ , আদা, রসুন আর বোরোলি মাছ ছাঁকা তেলে ভেজে তুলে নাও। দু চারটে শুকনো লঙ্কা আলাদা করে ভেজে মাছ ভাজাটার ওপর ছড়িয়ে দাও। এবার দুটো কাঁচা লঙ্কা মাঝামাঝি চিরে নাও , একটা লেবু ( পাতি অথবা গন্ধরাজ ) গোল গোল করে স্লাইস কেটে রাখো। এবার গ্লাসে তিন-চারটে বরফ কিউব দিয়ে মকাইবাড়ির রস মাখা ভদকা ঢালো। তার মধ্যে লঙ্কা চেরা গুলো ডুবিয়ে দাও আর লেবুর দুটো স্লাইস জাস্ট ভাসিয়ে দাও। সঙ্গে বোরোলি ফ্রাই। রায় বেরেলিতে জিতলেও এ মেজাজ পাবে না। মেজাজটাই আসল ! তবে আজ না। এখন ভরদুপুর। আমি সানডাউন না হলে কোহল Alcohol এ হাত দিই না। কোক চলবে ?'
নোলা গড়িয়ে লালা পাকস্থলী অবধি পৌঁছে গিয়েছে। অতএব , কী  আর করা যাবে , কোকশাস্ত্রতেই অনিচ্ছুক মনোনিবেশ করলাম। যার যেমন কপাল আর কী !!




Saturday, March 10, 2018

টান টান, টাই টান, বা টাকাপয়সার টানাটানি, সবই আসলে টাটা

মুম্বাকা শহর একটা ওয়াইড শট। ক্রেন মুভমেন্ট শুরু। কাট টু একটা ট্যাক্সির ভিতর। চেনা ক্যাটরিনা, পরিচিত তোতলা রণবীর।             ক্যাট --- হোটেল        আগাপাশতলা
                                           ট্যাক্সি চালক --- হুইচ আগাপাশতলা ?
                                                       ক্যাট --- কিতনি আগাপাশতলা ?
                                           ট্যাক্সি চালক --- ১০০ টোটাল ইন মুম্বাকা নেশন
                                                    রণবীর --- নো নো ৯৮
                                                       ক্যাট --- আই হোপ হি ইস জোকিং রাইট !
                                                     রণবীর --- জেইসে বিকানির কি গলি গলি মে হ্যায় বিকানিরী ভুজিয়াওয়ালা ওই সে মুম্বাকা কে হর এক মোড় পে হ্যায়                                 হোটেল আগাপাশতলা
আগাপাশতলা ভিরমি খাওয়ার জোগাড় অভিনেত্রী সহ গোটা হলের দর্শকদের। আসলে বাঙলার থেকে দূরে বড় হলেও বাঙলার থেকে ভৌগোলিক দূরত্বে কাজকর্ম করলেও পরিচালক অনুরাগ বসুর বাঙালিয়ানা মজ্জায় মজ্জায় লোহিত রক্ত কণিকায়। অনুরাগ এর প্রতিটি কাজ এ ( মানে সিনেমায়) হয় পরিষ্কার নয়তো প্রচ্ছন্ন ভাবে থেকে যায় বাঙালিয়ানা। হোটেল আগাপাশতলা , টিকটিকি স্টেশন, শুন্ডি আসলে সেই গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজোর ই প্রয়াস। ছবি তে ছুটে আসে ছেলে বেলার সবুজ ট্রেন যার বাদামি ধোঁয়ার পিছনে হারিয়ে যাই সাদা বেগুনি বগি গুলো।
মনে হয় আমাদেরও অমন একটা শৈশব ছিল যখন দিনগুলো সহজেই, কত সহজেই রঙিন হত। একটা হাঁসের ডিমের কুসুম রঙা সূর্য ছিল। একটা শীতের কমলালেবুর মতো বিকেল ছিল। একটা চার ছক্কা বাউন্ডারিতে সুনীল ছিল। একটা স্ট্যাম্প ওড়ানো বোলিং এ কোথাও কপিল ছিল। সাদা কালো টিভির মাঝে নুক্কড় আর বুনিয়াদে ভরসা ছিল। পাওয়ার কাটের লোডশেডিং এ গা ছমছমে একানড়ের কানে চড়া গল্প ছিল। শৈশবের মজাই হল লো অ্যাঙ্গেল শট এ দুনিয়া দেখার মজা। সবকিছুই বড় লাগে। বিশাল লাগে। দারুন লাগে। সহজেই রোমাঞ্চ জাগে। তাইতো শিশু বালক ছাগল ছানার মত অবিরাম ছটফটে। বালিকা প্রজাপতির মত রঙিন পাখনায় উড্ডীন। অদেখা টিম্বাকটু বা ঝুমরিতালাইয়া র খোঁজে সর্বদা Busy Without Business.

যা বলছিলাম তার থেকে ভেসে দূরে চলে এলাম। বোধহয় বয়স এর দোষ। কথাহীনতায় রোজনামচা , কথাহীনতাই অভ্যেস হতে হতে কথা বলতে গেলেই নীরবতার অন্ধকারে জোনাকির মত ছুটে আসে কথারা। ছোটবেলায় মানুষ শব্দ শেখে। শব্দ খোঁজেও। অজানা শব্দ পেলে মানে জানতে চায়। কিছু মানে পায় কিছু পায় না। উত্তর পায় "বড় হও সব জানবে "
সত্যি কি জানা যায় ? পাওয়া যায় শব্দার্থ। সেই কোন আলো আঁধারির স্মৃতির সময় থেকে বিদায় অভিবাদন জানিয়ে এসেছি। টাটা। কতবার। কতজনকে টাটা বলেছি। টাটা করেছি। টাটা আসলে কী? সিনেমার জগ্গা জাসুস তো তাও শতেক হোটেল আগাপাশতলার মধ্যে আসল হোটেল আগাপাশতলা খুঁজে পেল কিন্তু আমার বেলা ? ক্যা হ্যায় ইয়ে টাটা কা মসলা ? ইংরেজি হাই ৫ এ টাটার মজা নেই আছে উদ্দামতা। টাটা করার মধ্যে বিষাদ বিষাদ মুখমন্ডলে মেঘ মেঘ চোখে অশ্রু মাখা হাসি নিয়ে প্রতীক্ষা আছে। আছে যেতে নাহি দিব র টান। আর সেই অদৃশ্য আকর্ষণেই বোধহয় ফিরিয়ে আনে প্রিয় মানুষ টিকে। ফিরিয়ে আনে ফিসপ্লেট খোলা রেলপথ বাঁচিয়ে , ব্রেকফেল রাজপথ এড়িয়ে , দুর্যোগের জলপথ মাড়িয়ে। ফিরিয়ে আনে এটিসি হারানো বৈমানিক কে , দিকভ্রষ্ট নাবিককে , জীবন যুদ্ধে মার খাওয়া সাধারণ আটপৌরে নাগরিককে।
সিধু গুগুল জ্যাঠার কাছেও টাটার মানে গুডবাই। শুধুই কি একটা ইন্টারজেকশন বা ধন্বাত্মক অব্যয়?
দাশরথী থাকিলে বলিতেন, "জন্ম যদি তব বঙ্গে তিষ্ঠ ক্ষণকাল! পাগল না হাফপ্যান্ট? বাঙলায় বাস করে টাটা কে অব্যয় বলছ? ওনলি স্কাই ইজ দ্য লিমিট ফর টাটা। মানে কিন্তু শুধু টাটা স্কাই না। ওরে সিঙ্গুরে সিঁদুরে মেঘ দেখোনি বাপু! টাটা অনুঘটক ছাড়া অমন রাজনৈতিক বিক্রিয়া সম্ভব! বিক্রিয়ার আগের লাল রঙের বাঙলার মাটি দুর্জয় কখন রঙ বদলে সবুজ হয়ে মা আর মানুষের হাত ধরে নিল। টাটা ঝামেলা বুঝে মুখ গুঁজল গুজরাতে। বিক্রিয়ায় অবিক্রিত টাটা অতএব টাটা অনুঘটক। " ওরে দাশু ওটা অবিক্রিত নয় অবিকৃত। দাশু বলত," যাহাই সর্বাধিক বিকৃত তাহাই সর্বাধিক বিক্রিত। আনন্দে বাজারে ঘোরো কাগজটাগজ দেখোনি? চলি আমার এখন টাটা চলছে।" টাটা চলছে? মানে? " আরে টা টা, টাকাপয়সার টানাটানি"।
তবে সে যাই হোক হজবরল বুলন্দ ভারতে টাটা কিন্তু এক উজ্জ্বল উচ্ছল ছবি। মণিবন্ধে শুধু সময়ের তালে তাল রাখাই নয় সে যেন অহঙ্কার, আঙুলে হীরক ছটার চোখ ধাঁধানো দ্যূতিতে এক উপাখ্যান। সর জমীন এ আসমান তার ব্যাপ্তি। কৃষিপণ্য, সার, পণ্য পরিবহন, অটোমোবাইল, মোবাইল ফোন ও পরিষেবা, ওষুধপথ্য, হোটেল হাসপাতাল, ইমারতি দ্রব্য থেকে এরোস্পেস রিসার্চ, মিডিয়া, মার্কেটিং, তথ্য প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রে টাটার জয়জয়কার। খাবারে স্বাদের চাবিকাঠি নুন তাও টাটা সাম্রাজ্যের অবদান। সকালের চা দিয়ে আমাদের টাটারোজনামচা শুরু।
যত ট্রাক রাস্তায় চলে বেশিরভাগই টাটা। ট্রাক বলতেই পঞ্জাবি ড্রাইভার আর আসি টাটা আবার দেখা হবে, বা Ok TATA Fir Milenge, কখনও O TATA K কখনও আবার রাত্রে ডায়পার ব্যবহার করতে বললেও ধাবমান বাণীতে টাটার বানান ঠিক। Use Diper at Night OK TATA যেন জীবন নদীর সাঁতার কাটা ক্লান্ত এক পথিক বা প্রেমিককে আশ্বাস দিয়ে কালো পিচে চাকায় রুটির গন্ধ নিয়ে ছুটে চলেছে সে চালক, অন্ধকার রাতে। আলো ফুটলেই আসবে গন্তব্য , তারপর ঘর। তার আগে হাতে সময় কই! আসি ভাই টাটা।
এটা নাকি বলা হয় মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে জীবনের ঝাঁকি দর্শন করে মানুষ। পথ দুর্ঘটনায় ট্রাক চাপা পড়ে যার নটে গাছ মুড়োল তার কাছে আসি TATA তো পুনর্জন্মের প্রলোভন। তার ঝাঁকি দর্শনে তো ফিরবেই ফড়িং, বটের চারা, বুনো শালিক, নিদেনপক্ষে একটা খুচরো নগন্য চড়াই, পিঁপড়ে বা শ্যওলা। যে কোন রূপে আবার মৃত্যুর আগল ভেঙে ফিরে আসতে চাই। তাইতো যাই। টাটা তো আসলে যাওয়া নয় ফেরার প্রতিশ্রুতি  অঙ্গীকার।
শোনা যায় একবার কোন এক ইওরোপীয় হোটেলে ঢুকতে বাধা পান এক ভারতীয়। সেই হোটেলের দোরগোড়ায় ছিল এক বিজ্ঞপ্তি Dogs and Indians are not allowed inside সেই পরাধীন ভারতীয়  মনস্থ করেন এক প্রাসাদোপম হোটেল বানিয়ে উপহার দেবেন দেশের মাটিতে দেশীয় মানুষজনকে। তিনি আর কেউ নন জামসেটজি নাসেরওয়ানজি টাটা। প্রত্যয়ী প্রতিভাবানেরা বোধহয় এমন ই হন। কোন বিরোধ, ঈর্ষা, কলহের পাঁক তাদের স্পর্শ করতে পারেনা। তাঁরা নিজেদের লক্ষ্যে স্থির, অবিচল।
 গুজরাতের এক জরাথ্রুষ্টিয় পুজারি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ভারতের উজ্জ্বল অঁত্রপনিয়ে হয়ে ওঠা তাঁর জীবন ভারতীয় ইতিহাসে এক মহীরূহের মত। সাকচির আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের যাঁর ছোঁয়াতে টিসকো হয়ে ওঠা তাঁর নিজের নাম একটা নামের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটা ব্রান্ড একটা কালচার হয়ে ওঠা কোন রূপকথার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। সেই মানুষ বটগাছটির ১৭৯তম জন্মদিন সদ্য পেরোল। যদিও টাটা শব্দের অর্থ বিদায় বোধক কিন্তু আমাদের কাছে তার অর্থ আরও ব্যাপক আরও গভীর। যাকে ভেঙে খান খান করার ক্ষমতা কোন ২৬/১১র নেই।
আজকের মত টাটা।



Thursday, March 8, 2018

অসুর পদ্মকলি ও ভগবান - একটা না কবিতা



সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। যদিও নারীত্ত্বের জয়গান ৩৬৫ দিন জুড়েই। বাড়িতে মা , স্ত্রী , মেয়ে , বোন এরা ছাড়াও আমাদের জীবন জুড়ে রয়েছেন প্রচুর সহযোগী হাত যাঁদের ছাড়া জীবন অচল। আজ অনেক পুরানো অপ্রাসঙ্গিক একটা লেখা দিলাম। লিখেছিলাম ২৯শে ডিসেম্বর ২০১২ , যেদিন মারা যান নির্ভয়া। ছটা বছর পার। ছবিটা খুব একটা বদলায় নি। দিল্লির একটা ঘটনা গোটা দেশকে রাগে, ঘৃণায়, প্রতিবাদে , এক করে দিয়েছিল। আজ কেন জানিনা খুব মনে পড়ছে জ্যোতি সিং পাণ্ডের কথা। মাফ করবেন সুখের দিনে অ সুখ ডেকে আনার জন্য। এটা না কবিতা। কাব্ব্যি খুঁজতে যাওয়া বৃথা এখানে।

অসুর পদ্মকলি ও ভগবান 

মেয়েটার গর্ভে পদ্মফুল ছিল
বাতাস মাতানো ঘ্রান ছিল
আশ্বিনের পড়ন্ত হিমে
ধানের খোসার মাঝে জমা
দুধসাদা মিঠে রস ছিল
আর ছিল -
দুচোখভরা বেয়াড়া রকম
আকাশকুসুম স্বপ্নকলি।

সারা দেশ ওর মেডিক্যাল বুলেটিনে
মঙ্গল প্রার্থনা করছিল।
ছাত্রী, শিক্ষিকা, টিউশন পড়ায়
যে মেয়েরা,  যারা বাসের ভিড়ে
বুকে আর শরীরের নানা
চোরাগলিতে নির্লজ্জ্ব অস্বস্তিকর
হাতের ঠোক্কর খেতে খেতে অফিস যায়
আর অফিস থেকে বাড়ি ফেরে সেই মেয়েগুলো,
ব্যস্ত অফিস এক্সিকিউটিভ থেকে
প্রোডাকশনের হেয়ার ড্রেসার মেয়েরা,
পেট্রল পাম্পের কর্মী মেয়েরা,
শপিং মলের সুরক্ষার আর
ব্যাগেজ কাউন্টারের দায়িত্বে
থাকা প্যান্ট শার্টের সাথে
বেমানান শাঁখা-পলা, সিঁদুর
পরা মেয়েরা,
সেলস রিপোর্টে পুরুষদের পিছনে ফেলা বা সমানে থাকা মেয়েরা,
বিমান সেবিকা, ডাক্তার, নার্স, প্লাস্টিক কুড়ানি, মডেল, চাওয়ালি ,
ডাক ও তার বিভাগের মেয়েরা, শহরে
গ্রামেগঞ্জে, প্রতিদিন যারা সাদামাটা জীবন কাটায়,
খবরের শিরোনামে না থাকা সেই সব মেয়েরা --
লাদাখ থেকে লালগড় হয়ে লন্ডন
বা লস এঞ্জেলেস পর্যন্ত
তামাম মেয়েরা প্রার্থনা করছিল ;
আর কিছু লজ্জ্বিত পুরুষ -
সে সব মেয়েদের বাবা,দাদা, ভাই, প্রেমিকরা।

ফেসবুকে, ট্যুইটারে, টিভি চ্যানেলে,
মোমবাতিতে,কালো পতাকায়,
জল কামানে, কাঁদুনে গ্যাস আর
লাঠির সামনে প্রতিবাদ, প্রতিরোধও
করছিল।

কিন্তু পদ্মকলি ছিল তো মেয়েটির গর্ভে।
তাই অসুরেরা মেয়েটার
দুপায়ের ফাঁকে তাদের পুংদন্ড
পুরেও যখন ভেবেছে
'দন্ডটা কম হল'
তখন ঢুকিয়ে দিয়েছে
আস্ত একটা লৌহদন্ড।
আসুরিক নখ-দাঁত-লালমাখা-জিভ
মেয়েটার ছিঁড়ে যাওয়া যোনি, তলপেটে।
ফেটে গেল অন্ত্র, মূত্রথলি,
সংক্রমিত যকৃৎ,
বিষ মিশে গেল হৃদয়ে।
ধমনী, শিরা আর
স্নায়ু বেয়ে মৃত্যুর
পরোয়ানা জারি হল ঠিক
একশো চুয়াল্লিশ ধারার মতো।

সব প্রার্থনাদুয়ামান্নত
ব্যর্থ করে মেয়েটা
মারা গেল।

এবার দেবতাদের পালা।
খুঁটে খাবে মৃত মেয়েটার
কমলকুঁড়ি, নাকি
রক্ত মাখা ব্যালট।

*********************



  

Sunday, March 4, 2018

শুরু হল আন্দুল রোডকে যানজট মুক্ত করার জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান | Free Andul Road Traffic Blockade


আজ একটা অন্য রকম সকাল দেখল আন্দুলের লোকজন। একটা প্রত্যাশার সকাল , একটা অঙ্গীকারের সকাল একটা দলবদ্ধ আন্দোলন এর সকাল। শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের আনন্দ ধূলি উড়েছিল এই পুণ্যভূমিতে সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম আন্দুল। ২য় হুগলী সেতুর টোল প্লাজা পার করে আন্দুল রোডে ঢুকলেই শুরু হয়ে যায় প্রাণান্তকর যানজট , এ তথ্য সবার জানা। চাপা ক্ষোভ ছিল , উষ্মা ছিল। কিন্তু সংগঠিত ভাবে কোনো গণআন্দোলন কেন জানি দানা বাঁধছিলো না। আজ সেই গণআন্দোলন এর সূচনা হল। আন্দুল রোড নিয়ে আমার আগের ব্লগ পোস্টে জানিয়েছিলাম আন্দুল রোড ইউজার্স এসোসিয়েশন এর কথা।  এগিয়ে এলেন তাঁরাই। ঘড়ি ধরে সকাল ঠিক ১০টা থেকে আন্দুল বাস স্ট্যান্ডে শুরু হল আন্দুল রোডকে যানজট মুক্ত করার জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি।





জেলা শাসককে পাঠানো হবে এই সব সংগৃহিত স্বাক্ষর। কভার লেটারও তৈরী করে ফেলেছেন আয়োজকরা। অন্তত প্রায় ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪টি হাসপাতাল, ৩টি ব্যস্ত রেল স্টেশন , বোটানিক্যাল গার্ডেন ও আন্দুল রাজবাড়ির মত ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে এই রাস্তায় ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ট্রাফিকের চাপ থাকেই অপরিসর এই রাস্তায়। তারওপর রয়েছে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন এর ট্যাঙ্কার ট্রাক। রয়েছে অগুনতি টোটো , শামুকের গতিতে চলা ৬১, ৮০, ৫৯ নম্বর বাস ,রয়েছে মিনি বাস ও ২য় হুগলি সেতু দিয়ে চলাচল করা সাদা বাস। 

কোন এক অদৃশ্য কারনে এই রাস্তায় ঢুকলেই বাস অসম্ভব ধীর গতিতে চলে। একটু বেশি প্যাসেঞ্জার তোলার আশায় যখন তখন দাঁড়িয়ে পড়ে সে সব বাস। ফলে তাদের প্রায়ই লেট মেক আপ করার জন্য শুরু হয় রেষারেষি। ভোগান্তির শিকার সাধারণ নিত্যযাত্রী, স্কুল কলেজ পড়ুয়া , পথচারী আর সাইকেল আরোহী রা। গ্রীন করিডোর হয়ে যাওয়ায় কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ভারী পণ্যবাহী যান পরিবহন প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে হাওড়া পুলিশ। ফলস্বরূপ নাভিশ্বাস উঠেছে আন্দুল রোড এর। বিশাল বিশাল ট্রেইলার ট্রাক ঢুকছে আন্দুল রোডে। কোমায় চলে গেছে হাওড়ার অন্যতম পরিবহন করিডোর।
আন্দুল রোড ইউজার্স এসোসিয়েশন এর মুখপত্র সায়ম দাস জানাচ্ছেন শুধুমাত্র আন্দুল এ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেই থেমে থাকবে না তাঁদের কর্মসূচি। এরপর মৌরি মিলগেট , নিমতলা, চুনাভাটি , হাঁসখালি, বকুলতলা , দানেশ শেখ লেন, আমতলা ফাঁড়ি , কলেজ ঘাট সর্বত্র তাঁরা জনসচেতনতা তৈরী করে স্বাক্ষর সংগ্রহ করবেন। যাঁরা রোজকার কাজে কর্মে আন্দুল রোড ব্যবহার করেন সেই সমস্ত নাগরিককে এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানাচ্ছেন তাঁরা। আজই তৈরী হচ্ছে আন্দুল রোড ইউজার্স এসোসিয়েশন এর ফেসবুক পেজ যেখানে পাওয়া যাবে এই গণআন্দোলন এর আরো আপডেট।




    

Thursday, March 1, 2018

দোলের নেশা । হোলির মাদকতা

 এগুলো গতকাল কলকাতার বড়বাজার এলাকার ছবি। দোলের আগের দিন , আকাশে বাতাসে নেশা নেশা ভাব। তা তো হবেই। আমি আর আমার স্ত্রী আমরা যে কোনো উৎসব এর সময় ক্যামেরা নিয়ে গন্তব্য হীন ভাবে বেরিয়ে পড়ি।  তেমনই গতকাল এর এই ট্রিপ। চারদিকে আবির গুলাল রং এর মাঝে এই দৃশ্য আমার চোখ টানছিলো।

হাহাকার এর এমন কোলাজ দেখিনি। গুঁতোগুঁতি করে, ধাক্কা মেরে এতো লোকজন কিসের জন্যে হন্যে ?
দূর থেকে দেখে অন্য দিকে এগোলাম।
ফুটপাথে সারসার দোকান। অবাঙালি পরিবার এর বাবা মা সন্তান রা  রাস্তার ওপর অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসেছে। গুলাল এর গন্ধে ম ম করছে গোটা চত্ত্বর।



একসময় লিখেছিলাম

"পিচকিরিতে প্রাণ ঢেলেছি
এগিয়ে এলো দোল
রাই কিশোরী ও জানেমন
বিনোদবেনি  খোল"                     
                                                             চতুর্দিকে রঙের রায়ট। হাজারো চোখধাঁধানো রং এর পিচকিরি। বাজারের থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি হচ্ছে সব কিছু। অনেক রকমের পিচকিরি।  কোনটা চিরাচরিত  পিস্টন, কোনটা আধুনিক প্লাষ্টিক এর। এই যেমন এই দোকানটার দুইতলা জোড়া শোকেসে সাজানো রয়েছে শুধুই পিচকিরি।















অনেক রং। কোনটা বাঁদুরে কোনটা ভেষজ। কোনটা লাল কোনটা বেগুনি , কোনটা সবুজ কোনটা নীল। রঙের স্থায়ীত্ব অনুযায়ী দাম।

 পাইকারি ছাড়াও রয়েছে খুচরো ব্যবসায়ী রা। রং কেনার আগে টেস্ট করে নেওয়ার সুযোগ দিতে দিতে ওদের দোল শুরু হয়েছে সাততাড়াতাড়ি। রং থেকে বাঁচার জন্য রয়েছে ডিজাইনার টুপি স্কাল, চুল। রয়েছে মুখোশ বা মাস্কও।
 
রঙ খেলার এতো আয়োজনের মধ্যে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো ওই প্রথম ছবিটার। ওটা কিসের দোকান ? কোলাহল কলরব এর মাঝে একটা ঘোর কাজ করছিলো। ক্যানিং স্ট্রিট আর তার আশেপাশে মহাত্মা গান্ধী রোডের গলিগুলোতে এই দু এক দিন অন্য সব ব্যবসা মোটামুটি বন্ধ। সব ই রঙের দখলে।






এতকিছুর মাঝেও আবার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল ওই দোকান তা কিসের। ছবি বলছিল চেনা সুরাগৃহ কি ওটা ? মগজ বলছিলো মনে হয় না। মনমাথার দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। 

বড়বাজারের অতি পরিচিত প্রতাপমল গোবিন্দরাম গুলাল স্টোর।  ১৯০০ সালে স্থাপিত। শতবর্ষ প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় ভেষজ গুলাল। যে গুলালের বিশেষত্ত্বের জন্য দাম ও বাজারে চলতি গুলালের চেয়ে অনেকটাই বেশি। কতটা বেশি ?
গোলাপি গুলাল / আবির      ২০ গ্রাম  - ৬০   টাকা 
                                             ৫০ গ্রাম  - ১৩০ টাকা 
                                           ১০০ গ্রাম  - ২৩০ টাকা 

অন্য রঙের গুলাল / আবির   ২০ গ্রাম - ৫০   টাকা 
                                               ৫০ গ্রাম - ১০০ টাকা 
                                             ১০০ গ্রাম - ১৫০ টাকা 

এত দাম তারপরেও এত চাহিদা সুতরাং আবিরের গুণমানের সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্ট হল। সত্যি শুধুমাত্র মাদক এর নেশাই যে প্রকৃত নেশা নয় ! কেউ যেমন রাবড়ির নেশা করতে পছন্দ করেন তেমনই অনেকেই আবার আবির গুলাল এর নেশা করতেও পছন্দ করেন। আর এই নেশার জন্য অপেক্ষা পুরো একটা বছরের। 

সকলকে রঙিন শুভেচ্ছা। দোল হোলি ভাল কাটুক। Wrong নয় রঙ On হোক সব্বার জীবনে।